নারয়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
পুরান ঢাকার চকবাজারে বুধবার রাতের ভয়াবহ আগুনে ঝড়ে গেছে ৭৮ জন মানুষের প্রাণ। ঘটনাস্থলও পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তূপে। নিহতদের স্বজনদের আহাজারীতে ভারি ওই এলাকার বাতাস।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল থেকে গতকালই লাশ বুঝে নিতে শুরু করেছেন স্বজনরা। এসব সংবাদ প্রকাশে যখন গণমাধ্যমগুলো সোচ্চার। ঠিক সেই মুহূর্তে মানুষের মধ্যে জানার প্রবল আগ্রহ শুরু হয়- আগুনের সূত্রপাত আসলে কোথা থেকে।
এমন ঘটনায় শোকে মুহ্যমান পুরো দেশের মানুষ । পুরে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের দেহাবশেষ দেখেও সহ্য করার মতো না । তারপরও নিখোজদের খোজে কান্নার পাথর চেপে রেখে স্বজনদের দৌড়ঝাপে নাড়ো ফেলে দিয়েছে দেশবাসীকে । এমন শোকে আমরাও শোকাভিভূত ।
গতকাল ২১ ফেব্রুয়ারিতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে ঘটা পুরান ঢাকার নিমতলীর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কথা সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছে। নিমতলীর বীভৎস অভিজ্ঞতার পর সরকারের কর্তব্য ছিল আবাসিক এলাকায় কেমিকেল ফ্যাক্টরি এবং রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম অবিলম্বে অপসারন। কিন্তু রাষ্ট্র যেখানে নিয়মিত গুমখুন ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটায় সেখানে রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিকদের আবাসিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আশা করা দিবাস্বপ্ন মাত্র।
অতএব আবাসিক এলাকা থেকে ক্যামিকেল ফ্যাক্টরি এবং রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম সরে নি। তারই অনিবার্য পরিণতি চকবাজারে একই কারনে একই প্রকার ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং অগ্নিকাণ্ড।
ঘটল ২১ ফেব্রুয়ারিতে। যেন মনে করিয়ে দিতে যে ভাষা, সংস্কৃতি, জাতি চেতনা ইত্যাদি একটা ফ্যাশান বা বিমূর্ত ফ্যাস্টিভালে পরিণত হয়েছে, যার সঙ্গে একুশের বৈপ্লবিক চেতনার কোন সম্পর্ক আর নাই। অর্থাৎ একুশ নিছকই ফ্যস্টিভাল, বাংলা একাডেমিতে বই মেলার অনুষ্ঠান মাত্র। একুশের সঙ্গে নাগরিকতা, শহর পরিকল্পনা, আবাস নিরাপদ করা এবং সিটি কর্পোরেশানের দায় দায়িত্বের কোন যোগ নাই। ফলে ২০ তারিখ বুধবার রাত সাড়ে দশটার দিকে বিস্ফোরণ ঘটা এবং শহরে এতো বড় বিপর্যয় ঘটে যাবার ঘটনা চাউর হবার পরও ফেস্টিভাল বা কার্নিভাল চলেছে কোন ছেদ ছাড়া। মন্ত্রী মিনিস্টারদের রাজকীয় উদ্বোধন, বক্তৃতা ইত্যাদির মধ্যে পোড়া মাংসের কোন গন্ধ পাওয়া যায় নি। বলছি, কারণ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত আক্ষেপ ছাড়া কোন সঙ্ঘবদ্ধ নাগরিক ক্ষোভের বিস্ফোরণও আমরা দেখি নি। ফেইসবুকে একজন আক্ষেপ করে লিখেছেন, ২১ ফেব্রুয়ারির মঞ্চ থেকে এই বিপর্যয়ের জন্য শোক প্রকাশ, কিম্বা কোন না কোন ভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর স্মরণে কোথাও কোন শোকের আভাস দেখা যায় নি। কোত্থাও কার্নিভাল ম্লান হয় নি।
অতএব আমি এখন শুধু নিমতলীর রুনা, রত্না আর আসমার কথা ভাবছি। এবার চকবাজারে কোথায় আবার রুনা, রত্না আর আসমাদের পাওয়া যাবে! নিমতলীর বিপর্যয়ের পর শেখ হাসিনা যাদের কন্যা হিশাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর এই মমতার প্রশংসাও করি। সামাজিক সম্পর্কের গভীরতা এবং নিষ্ঠা সামাজিক নিরাপত্তার চাদর হতে পারে। শেখ হাসিনা তাদের বিয়ে দিয়েছেন এবং নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়ে থাকেন। ইতোমধ্যে তিনি নানীও হয়েছেন। পত্রিকায় মাঝে মধ্যেই তাঁর সন্তান বাৎসল্যের খবর পড়ে আপ্লূত হই।
নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে আপন দুই বোন রুনা ও রত্না তাদের মা, ভাইসহ নিকট আত্মীয় সাতজনকে হারান। ৩ জুন সেই ভয়ানক রাতে নিমতলীর বাসায় বাগদান হওয়ার কথা ছিল রুনার। সেই আয়োজনও সম্পন্ন ছিল। বাগদান উপলক্ষে বরপক্ষের লোকজনও এসেছিলেন রুনাদের বাসায়। সেখানে বরপক্ষের পরিবারেরও পুড়ে মরে সাতজন। আসমার বিয়ের কথাও পাকাপাকি ছিল। যে রাতে আগুন লাগল এর পাঁচদিন পরই তার বিয়ের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। নিমতলীর আগুনে আসমার মা, খালা, ভাতিজিসহ তিনজন পুড়ে মরে। ভাবি আর বাবা আগুনে পুড়ে যান।
ওই তিনজনের যখন কেউই ছিল না তখন নিজের মেয়ে হিশাবে স্বীকৃতি দিয়ে তিন কন্যার দায়িত্ব নিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। তাঁকে ধন্যবাদ জানাই। আগে থেকে ঠিক করা পাত্রদের সঙ্গে তাদের বিয়ে দেন। সেটাও তিনি করেন আগুনের পাঁচদিনের মাথায়। ৯ জুন গণভবনে মহা ধুমধামে শেখ হাসিনা তাদের বিয়ে দেন। এমনকি তিন কন্যার জন্য উকিলবাবাও তিনি ঠিক করে দেন। তাদের মধ্যে রুনার উকিল বাবা হন হাজী সেলিম, রত্নার উকিল বাবা হন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এম এ আজিজ আর আসমার উকিল বাবা হন তৎকালীন সংসদ সদস্য মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। আমরা খবর কাগজে শেখ হাসিনার জননীসুলভ মমতার খবর পরে আপ্লূত হয়েছি।
অতএব এখন আমাদের উচিত চকবাজারে রুনা, রত্না আর আসমাদের সন্ধান করা, যেন আমরা বাৎসল্য ও মমতার নিদর্শন আবার জারি রাখতে পারি।
আরে না না। আবাসিক এলাকায় কেমিকেল ফ্যাক্টরি এবং রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম অপসারণের দরকার নাই। কারন ব্যবসায়ীদের খুশি রাখাই অধিক দরকার। ব্যবসায়ীরা না চাইলে পুড়ে মানুষ মারার এই মৃত্যুফাঁদ সরানো যাবে না।









Discussion about this post