এনএনইউ রিপোর্ট :
এবার মশা মারতে কামান দাগাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও সিদ্ধিরগঞ্জের প্রভাবশালী কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি । আজ শনিবার বেলা ১১ টায় সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন সুমিলপাড়ায় সিটি কর্পোরেশনের মশা মারার মেশিন নিয়ে দলবল সাথে মশা মারতে মাঠে নেমে পড়েন এই বিতর্কিত কাউন্সিলর মতি । এমন মশক নিধনের চিত্র দেখে পুরো এলাকায় সারাদিনব্যাপী সিদ্ধিরগঞ্জরবাসীর মাঝে আলোচনা সমালোচনার ঝড় উঠেছে ব্যাপকভাবে ।
গত ৩ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার আদমজী নতুন বাজার এলাকায় সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের সমর্থক আবদুল হান্নান ও ইসমাইলদের সঙ্গে প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির অনুগামী আবদুর রাজ্জাকের ৯ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী সংর্ঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পাশাপাশি কাউন্সিলর মতির অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের অডিও রেকর্ড প্রকাশ পেলে ব্যাপক সমালোচনায় পরেন কাউন্সিলর মতি । প্রতিপক্ষের আঘাতে রক্তাক্ত মতি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় ব্যাপকভাবে সমালোচিত হন ।
এমন সমালোচনা ধামাচাপা দিতে আজ ১২ জানুয়ারী শনিবার দুপুরে সুসজ্জিত পেষাক পরিচ্ছেদে মশক নিধনে নামার পর এলাকার অনেকেই সমালোচনা করে বলেন, “কাউন্সিলর মতি নিজেকে আবারো আলোচনায় রাখতে এখন মশক নিধনসহ নানা সমাজসেবামূলক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে এলাকার আলোচনায় থকতে চাইছে ।
কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতির গালিগালাজের ধরণ :
রেকর্ডকৃত তথ্য থেকে জানা যায়, সংঘর্ষের আগে জমির মালিক ইসমাইলের মুঠোফোনে কল করেন প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির সহযোগী মানিক। প্রথমে ইসমাইলকে কাউন্সিলর অফিসে আসতে বলেন মতির সহযোগী মানিক। তখন ইসমাইল মানিককে বলে সে এখন নামাজে যাবে মাগরিবের নামাজের পরে সন্ধ্যায় কাউন্সিলর অফিসে আসবেন। তখন মানিক প্যানেল মেয়র মতিকে ফোন দিলে ইসমাইল প্যানেল মেয়র মতিকে সালাম দেয়। কিন্তু মতি সালামের জবাব না দিয়েই তাকে বলে, এক্ষুনই আসবি নাকি লোক দিয়া ধরাইয়া আনমু। ইসমাইল তাকে নামাজের পরে কাউন্সিলর অফিসে আসবে বলে জানালে মতি ক্ষুব্দ হয়ে তাকে বলে এখনই না আসলে তাকে পেটাতে পেটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনা হবে। মতি তখনই তার অনুগামীদের নির্দেশ দেন ইসমাইলকে পিটাতে পিটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনার জন্য। তখন মতি ইসমাইলকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে তাকে জিজ্ঞেস করে তোর জন্মদাতা কয়টা। তুই আমারে চিনস ? তখন ইসমাইল মতিকে বলে ভাই আপনি এভাবে গালাগালি করছেন কেন। আপনি কথা ভাল মতো বলেন। তখন মতি আরো ক্ষুব্দ হয়ে ইসমাইলকে বলে তোকে কেন এর জবাব দিতে হবে। তুই পার পেয়ে গেছিস বলে মনে করছস। আমি তোরে দেইখ্যা দিমু। তোর জায়গা…তোর…। তুই এখন আমার অফিসে হাজির হবি। তোর বাপে তোরে অর্ডার দিসে আমি তোর বাপ তোরে পিটামু তুই এখন অফিসে আয়। তোরে আমি কি করি তুই দেখবি। এই বলে প্যানেল মেয়র মতি ফোন রেখে দেন।
এসময় ইসমাইলকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দও করেন এবং তাকে দেখে নেয়ার হুমকী দেন কাউন্সিলর মতি। গালিগালাজের ধরণ এতটাই উগ্র যা যে কোন সাধারণ মানুষ সহ্য করতেও কস্ট হওয়ার কথা । আর মতিউর রহমান মতির আচরণ দেখে অনেক ভুক্তভোগি ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, কথায় কথায় অস্ত্র বের করে পুরো এলাকার সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করে আসছে মতি । সাত খুনের পর মতি যেন আরেক নূর হোসেন হিসেবে এলাকায় আবির্ভার ঘটেছে । তার নিয়ন্ত্রণে বিশাল বাহিনী ছাড়াও নূর হোসেনের কায়দায় মতি অনেক বিশেষ শ্রেনী পেশার লোকজন এবং প্রশাসনের অনেক অসাধুদের লালন পালন করে আসছিলো কয়েক বছর যাবৎ।
আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইল জানান, তার বড় ভাই ইব্রাহিমের মাথায় ১৯৯৪ সালে বিএনপির সন্ত্রাসীরা গুলি করেছিলো। তখন গুলিবিদ্ধ ইব্রাহিমকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন জননেত্রী শেখ হাসিনা। আমরা আওয়ামীলীগের একনিষ্ঠ কর্মী হলেও যুবলীগ সভাপতি ও প্যানেল মেয়র মতি স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের উপর কি পরিমাণ নির্যাতন চালাচ্ছে মতি তা এলাকার সকলেই খুব ভালো করে টের পাচ্ছেন ।
অথচ ১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টির ক্যাডার মতি যোগ দেয় যুবলীগে। নিরীহ মানুষের জায়গা জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে এবং অবৈধভাবে চোরাই তেলের ব্যবসা করে শতকোটি টাকার মালিক হয়ে তিনি কাউকেই তোয়াক্কা করে না কাউকেই। আমাদের পৈত্রিক জমিও তিনি ওয়ারিশানের নাম দিয়ে দখলের চেষ্টা করছেন। বৃহস্পতিবার সে দলবল নিয়ে আমাদের জমি দখল করতে আসলে আমরা তাদেরকে বাধা দেই। মতির আহত হওয়ার বিষয়টি সকলের নজরে আসলেও কি পরিমাণ তান্ডব সে করেছিলো তা অনেকের অজানা। পরবর্তীতে মতির ক্যাডাররা আমাদের বসতবাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যপক ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। এসময় তারা আমাদের বসতবাড়িতে থাকা গৃহবধুদেরও শ্লীলতাহানি করতে একটুকুও হাত কাপে নাই মতি বাহিনীর সন্ত্রাসীদের ।
বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন নারায়ণগঞ্জ জেলার শাখার সভাপতি ও সাবেক নাসিক সিরাজুল ইসলাম মন্ডল অভিযোগ করে জানান, রাজ্জাক, হানান শেখ ও ইসমাইল তারা সকলেই মতির সমর্থক। তারা আমার সমর্থক নয়। তাদের সঙ্গে জমি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। কিন্তু এ ঘটনায় মতির সমর্থকরা আমার এক সমর্থককে মারধর করেছে ও তারা বঙ্গবন্ধু কাউন্ডেশন, সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শাখার কার্যালয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে। ওই কার্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি, শেখ হাসিনার ছবি, শামীম ওসমানের ছবি পুুড়িয়ে দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার ৪ জানুয়ারী মধ্যরাতে সংঘর্ষের ঘটনায় পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছেন মতির ভাই ও প্রতিপক্ষ রোকেয়া বেগম। মতির ভাই মাহবুবুর রহমান মামলায় উল্লেখ করেন, তার ভাই প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি ৩ জানুয়ারি সকালে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে বের হয়। এসময় পথিমধ্যে ইসমাইল, হান্নান, ফারুক, মজিবর, নাঈম, আলমগীর, হাসান, মোস্তফাসহ অজ্ঞাত ১৫ জন মতিকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে। এতে সে মারাত্মক আহত হয়। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এ হামলা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ মামলায় ফারুককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
কে এই প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি :
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আইলপাড়া মোঃ বাদশা মিয়ার পুত্র এলাকার মতিউর রহমান মতি আদমজী পাট কারখানায় একজন সাধারণ শ্রমিক ছিলেন। সে সময়ে আদমজীতে একক কর্তৃত্ব ছিল আওয়ামীলীগের শ্রমিক নেতা রেহান উদ্দিন রেহান ও তার বাহিনীর। ১৯৮৯ সালে আদমজীর আলোচিত শিল্পপতি ও চলচিত্র ব্যবসায়ী সফর আলীর ভূইয়ার হাত ধরে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয় মতি। মতির এ প্রভাব বিস্তার রেহান গ্রুপের সঙ্গে মতির নিয়মিত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পরে রেহানের হাত ধরেই আওয়ামীলীগে যোগ দেয় মতি। ১৯৯৮ সালের ভয়াবহ বন্যায় সরকারী ত্রাণ দেওয়ার দায়িত্ব পায় মতি, জাফর ও রেহানের স্ত্রী সুফিয়া রেহান। সেসময়ে ত্রাণ আত্মসাৎ করে রাতারাতি মতির ভাগ্য বদলে যায়। সেসময়ে থানা যুবলীগের আহবায়ক পদ নিয়ে অপর দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ক্রসফায়ারে নিহত জাফরের সঙ্গে মতির বিরোধ নিয়ে তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। পরবর্তিতে আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে মতিকে আহবায়ক ও জাফরকে দেওয়া হয় আদমজী নগর যুবলীগের সহ-সভাপতির পদ। ২০০১ সালের নির্বাচনের আওয়ামীলীগের ভরাডুবির পর দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয় মতি। সেখান থেকে চলে যায় দুবাই। পরে প্রায় দুই বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করেন।
দীর্ঘ আট বছর পলাতক থাকার ২০০৯ সালের জুন মাসে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পন করেন ওই সময়ের ইন্টারপোলের রেড ওয়ারেন্টভুক্ত নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ও থানা যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতি। মতির বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় তিনটি হত্যা সহ ২০টি ও বিভিন্ন মামলায় আরো ৭-৮টি মামলা ছিল। বেশীরভাগ মামলায় তিনি জামিনে রয়েছেন। দীর্ঘ আট বছর ধরে মতি ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা ও দুবাই পলাতক ছিলেন।










Discussion about this post