নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রীর একজন আত্মীয়ের কবর ভেঙে সেখানে জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার বোনকে দাফনের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে শোকজের কথা জানিয়েছেন সিটি মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ।
১৬ ডিসেম্বর বুধবার দুপুরে শহরের ২নং রেল গেইট এলাকায় আওয়ামীলীগ কার্যালয়ে মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে জেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য তিনি এসব কথা বলেন।
নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আরজু রহমান ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সংরক্ষিত নারী আসনের সাবেক সাংসদ হোসনে আরা বেগম বাবলী, আওয়ামীলীগের জাতীয় পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান দিপু, জেলার আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আসাদুজ্জামান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।
এর আগে বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে আওয়ামীলীগ কার্যালয়ের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে জেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে বঙ্গবন্ধু চত্ত্বরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান মেয়র আইভী।
আইভী বলেন, এমপি (লিয়াকত হোসেন খোকা) এ দুঃসাহসিক ভাবে আমাদের জননেতা আনোয়ার সাহেবের নামফলক ভেঙে দিলো ওনিই কিন্তু কিছুদিন আগে আমাদের বঙ্গবন্ধুর আত্মীয় মামা তাঁর কবর রাতের আধারে (রাত ১টায়) সেই কবর ভেঙে সেখানে তার বোনকে দাফন করেছে। এর চেয়ে লজ্জাজনক কি হতে পারে। একটি পাকা করা কবর, সিটি করপোরেশনের অনুমতি না নিয়ে জোর করে একজন এমপি এ কাজটি করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। দেখেন ওনিতো করেছে, ওনার জন্য আমি গতকাল এ চিঠি পেয়েছি তাদের রশিদ সহ যদিও আমাদের তত্ত্বাবধায়ক আমাদের জানায়নি ভয়ে এতো দিন। আমরা যখন জানতে পেরেছি তখন আমার তত্ত্বাবধায়ককে সরিয়ে দিতে হয়েছে। মৌলবী সাহেবকে আমার শোকজ করতে হয়েছে। এখন এতো বড় ক্ষমতাধর এমপিকেও আমি বাধ্য তাকে চিঠি দিতে। তার জবাবদিহিতার জন্য। আমি তাকে জবাবদিহিতার জন্য নিয়ে আসবো। দুর্বৃত্তায়ন করতে করতে মানুষ কোথায় চলে যায়। কবরে যেয়েও দুর্বৃত্তায়ন। এটার নামই পতন। অনিবার্য পতন যখন মানুষের শুরু হয় তখন মানুষ অনেক মিথ্যা কথা বলা শুরু করে। ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ শুরু করে। মানুষের নামে অবৈধ কথা বার্তা বলা শুরু করে। আমি সেই এমপিকে ধিক্কার জানিয়ে বলতে চাই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কি করতে পারবেন, সেই পরিবারের কাছে গিয়ে ক্ষমা চান। তাদের অনুমতি নেন। অথবা আমি বাধ্য হবো আপনাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।
প্রসঙ্গত আবারো বিতর্কে বিঁধলেন নারায়ণগঞ্জ-৩ তথা সোনারগাঁও আসনের জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা। সম্প্রতি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের নাম ফলক ভেঙে যখন আলোচনা সমালোচনা তুঙ্গে তখন খবর বেরিয়েছে তিনি নিজে থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে একজন সরকারী কর্মকর্তার ক্রয়করা কবর ভেঙে নিজের বোনকে দাফন করেছেন। দাফনের আগে কবর ভাঙার সময়ে কবরস্থানের লোকজন বাধা ও আপত্তি দিলেও তিনি উল্টো তাদের হুমকি দেন। যাঁর কবর ভাঙা হয়েছে সেই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় জানা গেছে।
জানা গেছে, লিয়াকত হোসেন খোকার বড় বোন খালেদা খানম ডলি ১৭ নভেম্বর রাত ১০টা ৫৯ মিনিটে রাজধানীর আজগর আলি হসপিটালে মৃত্যুবরণ করেন। সে রাতেই এমপি খোকা যান শহরের মাসদাইর এলাকাতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কবরস্থানে। সেখানে গিয়ে তিনি ১৯৮৩ সালের ১৪ জুলাই মৃত্যুবরণের পর দাফন করা শেখ ইসরাইল হকের কবর ভাঙতে বলেন। ওই কবরের চারদিকে তখন পাকা বাধাই করা ছিল। তাছাড়া কবরটি ছিল তাদের ক্রয় করা। কিন্তু এমপি খোকা ওই কবরটি তার নিজের বাবা ও মায়ের দাবী করে সেটা ভাঙতে বলেন। তখন কবরস্থানের লোকজন বিষয়টি নিয়ে আপত্তি করলে তাদের হুমকি দেওয়া হয়। পরদিন ১৮ নভেম্বর ভোরে ফজরের নামাজের পরেই খোকার বোনকে দাফন করা হয়ল চারদিকে দেওয়া হয় মাশের মুলির বেড়া।
এ ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে অভিযোগ দিয়েছেন শহরের দেওভোগ এলাকার বাসিন্দা ডা. শাহানা পারভীন। তিনি দাবী করেন তার আমার বাবা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নানীর চাচাতো ভাই।
শাহানা পারভীন বলেন, আমি বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে চাকরি করেছি। বর্তমানে অবসরে আছিন। আমার ছেলে সরকারের একজন উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা। আমার ছেলে কবর জিয়ারত করতে গিয়ে দেখেন নানা ডা. শেখ ইসরাইল হকের কবর ভাঙা। ভালো পুরানো কবরের দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। নাম ফলক ও ইটগুলো পাশে রাখা হয়েছে। সে কবরই চিনতেই পারেনি। পরে কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক জানান এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা উপস্থিত থেকে ভেঙেছে।’

শাহানা আরো বলেন, ১৯৮৩ সালের ১৪ জুলাই আমার বাবা শেখ ইসরাইল হক মৃত্যুবরণ করেন। দুই বছর পর ১৯৮৫ সালে ওই সময়ে পৌরসভা থেকে ক্রয় করে কবর পাকা করা হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমি বলতে পারছি না ওনি এটা কেন করলো। আমরা জলদস্যু, ভূমিদস্যুর খবর জেনেছি। কিন্তু কবরদস্যুতো শুনি নাই। সে তো কবর দস্যুতা করেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার পিতার কবর তো এভাবে ফেলে রাখতে পারি না। আমরা তার কবর পুনরায় বাঁধাবো। ওনার থেকে একটা পয়সাও নেবো না। পুরোনো ইট দিয়েই আমরা বাঁধাবো সেটা। যেহেতু কবরটি সিটি করপোরেশনের অধীনে সেহেতু এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মেয়র আইভীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। তিনি এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
সরকারি কর্মকর্তা হওয়ায় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডা. শেখ ইসরাইল হকের নাতি বলেন, ‘এমপি সাহেবে আমাদের কাছে ফোন দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। আমরা বললে তিনি বোনের লাশ সরিয়ে নিবেন এমনটাও স্বীকার করেছেন। পরিবারের অন্যদের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তীতে পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমার নানার বাড়ি গোপালগঞ্জ টুঙ্গিপাড়া। মৃত্যুর আগে তিনি আমার মায়ের কাছেই ছিলেন। ফলে নারায়ণগঞ্জে মৃত্যু হওয়ায় মাসদাইর কবরস্থানে মরদেহ দাফন করা হয়।’
নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় কবরস্থানের তত্ত্বাবধায়ক গোলাম মোস্তফা বলেন, ‘১৮ নভেম্বর ভোরে এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার বড় বোন খালেদা খানমের মরদেহ দাফন করা হয়। ব্যক্তি মালিকানাধীন কবর হওয়ায় রাতে আগের যখন কবরটি ভাঙতে যায় তখনই বাধা দেওয়া হয়। তখন আমাকে ধমক দিয়ে কবর ভেঙে ফেলে।’
কবরস্থানের সুপারভাইজার মো. স্বাধীন চৌধুরী সাদেক বলেন, ‘এমপি সাহেব (লিয়াকত হোসেন খোকা) রাতে বলেন এখানে তার বাবা মায়ের কবর ছিল। এজন্য তিনি ভেঙে বোনের মরদেহ দাফন করেন। আর তার বোন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যার জন্য এ বিষয়ে তেমন কোন কিছু বলা হয়নি। কিন্ত সম্প্রতি কবরস্থানে এসে বিষয়টি দেখে আমাদের জানান যার কবর ভাঙা হয়েছে তাঁর স্বজনেরা। এমপি সাহেব মিথ্যা তথ্য দিয়ে অন্যের কবর ভেঙে অন্যায় করেছেন।’









Discussion about this post