‘একেই বলে দর্পচূর্ণ । ছোট্ট একটি ঘটনায় তছনছ হয়ে গেলো দম্ভকারী রাজধানীর পুরাণ ঢাকার সবচাইতে ক্ষমতাধর সংসদ সদস্য হাজী সেলিমের পরিবার । এই পরিবার তো অনেক দূরের বিষয়, হাজী সেলিমের যে কোন সাধারণ কর্মী সমর্থকদের সম্পর্কে (বিরুদ্ধে) কথা বলার দুঃসাহস কারো নেই পুরো এলাকার । আর এমন আকাশচুম্বি ক্ষমতা এক নিমিষেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে এক নিমিষেই । যা দেখে অনেক দম্ভকারী নেতা ও চেলাচামুন্ডারা চুপসে গেছে
এই এমপি পুত্রের পরিণতি দেখে সকলেই সতর্ক হবেন। মানুষের সাথে কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। কিভাবে মিশতে হয়-সবই শিখবেন। মানুষকে সম্মান করতে শিখবেন। শিখবে শ্রদ্ধা ভক্তি। নইলে এভাবেই জেল খেটে মরতে হবে। মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার দম্ভ দেখাতে দেখাতে একদিন এমন সময় আসবে আম-ছালা দু’টোই যাবে।
কোন ক্ষমতা কাজে আসবে না। ক্ষমতা আইনের ক্ষেত্রে আবেগ ও পক্ষ বর্জিত হয় সভ্য সমাজে। পিতাও কখনো কখনো আদারের ধন পুত্রকে রক্ষা করতে পারে না। কেননা পুত্রটি যে সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে অপরাধী !’
সরকারের কঠোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র বিভিন্ন আড্ডার লোকজন। এমন মন্তব্যের জন্য একমত পোষণ করেছেন সকলেই ।
পুরনো ঢাকার এমপি হাজী সেলিমের পুত্র এরফান সেলিম একজন নৌবাহিনীর বড় অফিসার ও তাঁর স্ত্রীকে মারধর করে যে ন্যাক্কারজনক ঘটনার জন্ম দিয়েছেন শহরজুড়ে এটাই ছিল নারায়ণগঞ্জের টক অব দ্যা টাউন।
শহরে বুদ্ধিজীবীদের আড্ডাস্থল বোসকেবিনে চায়ের টেবিলে ঝড় বয়ে যায় আলোচনা সমালোচনায়। পুরনো আড্ডাবাজরা বসেই থাকেন নিত্যনতুন টপিকের জন্য। এমপি পুত্রের ঘটনায় তাদের মুখে যেন খই ফুটছিল।
বাবুরাইলের একজন আড্ডাবাজ বলে উঠলেন, ‘একেতো এমপি’র ছেলে। নিজে আবার কাউন্সিলর। ক্ষমতার শেষ নাই। এত ক্ষমতাবান মানুষ কোথায় রাখবো হাত, কোথায় রাখবো পা- তার কোন দিশা থাকেনা। মনে করে ঢাকা শহরটাই নিজস্ব সম্পত্তি। ভদ্রলোক নৌবাহিনীর পরিচয় পর্যন্ত দিছিলো। পরিচয় পাইয়াও এরফান সেলিম তাকে মারধর করেছে। আবার তার স্ত্রীকেও লাঞ্চিত করেছে। এতটা ক্ষমতা দেখানো ভালো না।’
‘বাপধন এইবার যাইবা কই! তোমার বাবার এত ক্ষমতা। তোমার বাবায়তো কিছু করতে পারবো না।’ দেওভোগের কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে পাইকপাড়ার একজন প্রবীণ আওয়ামীলীগ নেতা বললেন, ‘ভাইরে নেতাগো পোলাপাইনরা রাস্তায় নামলে কি যে করে-কি কমু! বাপে নেতা অইলেই পোলায় নেতা অইয়া যায়। বড় মাইনষেরে হুকুম দেয়। শ্রদ্ধা ভক্তি থাকে না। বাপে এমপি ছেলে রাস্তাঘাটে যা খুশি তাই করে। হয়তো একটা ঘটনায় একজন ধরা খাইলো। আরো অনেক ঘটনা গেছে। আমরা কয়টার খবর রাখি। আমরাতো এককাপ চা ও সিগারেট পাইলেই চামছামি করি। চোখের সামনে এমপি’র পোলারা কোন অন্যায় করলে কেউ বলে না-তুমি অন্যায় করছো। উল্টা সবাই চায় বিষয়টা ঢাইক্কা রাখতে। দেখো ঢাইক্কা রাখলে কি অয় ? পরিণতি কত কষ্টের অয়। এরফান সেলিম তার প্রমাণ এবং হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে এমপি হাজি সেলিমের পরিবার।’
দু’জন আড্ডাবাজ বললেন, ‘শুধু হাজী সেলিমের ছেলে নয়, অনেকেই এমন ঘটনার জন্ম দেয়। ক্ষমতা দেখায়। আঙুল কাটার একটা গল্প শুনছিলাম। তার আর হদিশ পাই নাই। নারায়ণগঞ্জেই কথা না শোনায় এক যুবকের আঙুল কেটে নেয়া হয়েছিল। এই অন্যায়ের বিচার হয় নাই। সবকিছু ধামাচাপা পড়ছিল। তবে সময় আইতাছে অনেক কিছুই দেখা যাইবো। অন্যায় অন্যায় করতে হঠাৎ একদিন ধরা খাইবো। কথায় আছে দশদিন চোরের, একদিন গৃহস্তের। চুপি চুপি অন্যায় কইরা আস্তানায় গিয়া বইসা থাকবা। মনে করবা সবাই বোকা। তুমি একাই একশো। একদিন আসবে তোমার নিরানব্বই কাটা যাইবো-তুমি একা হয়ে যাইবা। সেদিন তোমারে বাঁচানোর মত কোন স্বজন থাকবো না। কারণ তুমি দুনিয়ার কাছে সভ্য সমাজের কাছে তোমার পরিচয় হবে খুনি কিম্বা অপরাধী হিসেবে। যে পরিচয় শুনে সবাই ছিটকে সরে যাব। তুমি একা জেলখানায় পঁচে মরবা।’
একটি গানের কলি মনে করে গলাচিপার একজন আড্ডাবাজ বললেন, ‘ছবিটার নাম আছিলো বড় ভাল লোক ছিল। অই সিনেমায় একটা গান আছিলো তোরা তোরা দেখ দেখ, দেখরে চাহিয়া-চোখ থাকিতে এমন কানা কেমন করিয়া। আসলে আমরা সব কানা অইয়া গেছি। কিছুই দেহি না। চোখের সামনে কোন অন্যায় দেখলে চোখ বুইজ্জা থাকি। মনে মনে বলি আমার কি ! অমুকের লগে অন্যায় করছে আমার কি। আসলে এটাই ভুল। একদিন আমার সাথেই কেউ অন্যায় কইরা আমার হাতের আঙুল কাইট্টা নিতে চাইবো। ত্বকির মত আমার ছেলেটারে হত্যা কইরা নদীতে লাশ ভাসাইয়া দিব। সেদিন অন্যেরা ঘটনা দেইখাও পাশ কাটাইয়া চইলা যাইবো। আমি একা বুক ফাটা আর্তনাদ করমু। কেউ আমারে বাঁচাইতে আইবো না। কারণ আমিও কারো বিপদে সাহায্য করতে যাইনা। আসলে আমাগো স্বার্থপরতা ত্যাগ করতে অইবো। নাইলে সমাজটা ধ্বংস অইয়া যাইবো।’
আড্ডার শেষ দিকে কয়েকজন বললেন, আসলে আজকাল রাস্তাঘাটে কেউ কারো নয়। কেউ বিপদে পড়লে আমরা মজা দেখি। বিপদগ্রস্ত মানুষটার পাশে দাঁড়াতে চাই না। আমাদের উচিত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সাধ্যমত সহযোগীতা করা। তাহলে আমরা মানুষ। না হলে আমরা কিসের মানুষ ! নৌবাহিনীর অফিসারের সাথে এরফান সেলিমের অঘটনের সময় রাস্তার লোকজন সাহস করে এগিয়ে আসলে এরফান সেলিম এতবড় অন্যায় করার সাহস পেত না। সে কিছুটা হলেও নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়তো। ভাবতো পাবলিক বিগড়ে গেলে গণপিটুনী খেতে হবে। সে দমে যেত। বাধ্য হত নিজেকে দমাতে।
কিন্তু রাস্তার পাবলিক কেউ এগিয়ে আসেনি। আজকাল রাস্তাঘাটে হিজড়াদের খপ্পরে পড়তে হয়। একজন ভদ্রলোককে হিজড়েরা হেনস্তা করলে কেউ এগিয়ে আসে না। তাহলে হিজড়ে কারা ? প্রশ্নটা সামনে চলেই আসে। মানুষ মেরুদন্ড সোজা করে দাঁড়াতে ভুলে গেছে। প্রতিবাদের ভাষা হারিয়েছে। সাহস হারিয়ে নপুংসকের মত একলা চলো নীতিতে চলতে শুরু করেছে কাউকে না ডেকেই। কবিগুরু একলা চলার কথা বলেছেন ডেকে কাউকে সাথে না পেলে। আমরা করছি উল্টোটি। কাউকে না ডেকেই একলা চলছি। আমরা একলা চলতে শিখেছি বলেই নেতার ছেলে পেলে ও চামচা লেংগুররা রাস্তাঘাটে অঘটন ঘটাতে সাহস পাচ্ছে। আসুন আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে কাজ করি। পরের বিপদে পাশে দাঁড়াই।
সমাজটা বদলে যাবে। হুট করে একদিন দুইদিনে হয়তো বদলাবে না। তবে চর্চাটা শুরু হলে বদলাবেই। এরফান সেলিমের মত এমপি পুত্ররা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেকে শুধরে নিতে বাধ্য হবে। নইলে জেলখাটা ও একাধিক মামলাই হবে ভবিতব্য। আহাহা আমরা এমনটা চাই না। আমরা চাই আদরের দুলাল আদরেই থাকুক। দুধভাত খেয়ে দিন কাটুক।









Discussion about this post