নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
কাটায় কাটায় ১১ মাস নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার হিসেবে চাকুরী করার পর বিতর্কিত কর্মকান্ডের অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ থেকে সরিয়ে দেয়ার পর বৃহস্পতিবার ৭ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে আলোচিত সমালোচিত কর্মকর্তা মোহাম্মদ হারুন অর রশিদকে বিদায় সংবর্ধনা দেয়া হয়েছে।
রোববার ৩ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয় থেকে তাকে পুলিশ সদর দফতরে বদিল করা হয়। তার নতুন দায়িত্ব পুলিশ সুপার (টিআর)। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব ধনঞ্জয় কুমার দাস স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।
২০১৮ সালের ৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদান করেন মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। যোগদানের পর থেকে বিভিন্ন অভিযান পরিচালনা করে নতুনভাবে আলোচনায় আসেন তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ লাইনে অনুষ্ঠিত বিদায় সংবর্ধনাকালে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশনের এক কর্মকর্তার সাথে যোগসাজস করে আরেক বিতর্কিত পুলিশ সুপার আনিসুর রহমানের উপর আওয়ামীলীগ তকমা দেয়ার পাশাপাশি গোপালগঞ্জ ও দলীয় সংরক্ষিত সংসদ সদস্যের স্বামী হওয়ার দোহাই দিয়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে বদলী করিয়ে ব্যাপক নাটকীয়তার পর নারায়ণগঞ্জে পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করে এসপি হারুন। এসপি হারুনের নারায়ণগঞ্জে যোগদান ও বিদায় দুটোই বিতর্কিত ।
আর এই ১১মাসের ফিরিস্তিতে ব্যপক প্রশংসিত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি ঘটনা তাকে বির্তকিত করলেও অনেকের মতে, এসপি হারুন নারায়ণগঞ্জে প্রচন্ড ঝাকুনি দিয়ে গেছেন ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে । আর এতোটা নন্দিত-নিন্দিত হতে পারেন নি এর আগে অন্য কোন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা ।
ব্যপক আলোচনায় আসে হকার ও অবৈধ দখল উচ্ছেদ অভিযান। বেশ কছিুদিন নগরজুড়ে শান্তিতে চলাচল করতে পেরে সাধারনের দোয়া পেয়েছিলেন পুলিশ সুপার। ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জের এসপি হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর পরপর তিনবার সহ সর্বমোট ৬ বারের মতো ঢাকা রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ এসপি নির্বাচিত হন তিনি।
রাস্তা দখলমুক্ত করা, প্রভাবশালীদের হাত থেকে ফ্ল্যাট মুক্ত করে প্রকৃত মালিকের কাছে হস্তান্তর, এতিমদের সম্পত্তি ও মিল-কারখানা ফিরিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন কাজের জন্য প্রশংসিত হতে থাকেন। প্রতিদিনই সকালে এসপি অফিসে শত শত মানুষ তার কাছে দেখা করতে ভীড় জমিয়েছে। তুলে ধরেছেন ‘নির্যাতিত ও নিপিরীত হওয়ার গল্পও’।
৭ ফেব্রুয়ারি পাগলার শাহ আলম গাজী ওরফে টেনু গাজীকে গ্রেপ্তার করা হয়। যিনি নিজেকে একজন সংসদ সদস্যের বন্ধু পরিচয় দেন। নগরের ৫ নম্বর ঘাট এলাকা থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি বিআইডব্লিউটিএ এলাকায় জুয়ার বোর্ডে অভিযান চালিয়ে ৪১ জুয়াড়িকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই ঘটনায় সাংবাদিক জড়িয়ে একটি ঘটনা সমালোচনা তৈরী হয়।
১৮ এপ্রিল দুপুরে পাইকপাড়া এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় ১৭নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবু ওরফে ডিসবাবুকে। ২০ এপ্রিল ফতুল্লা থানা পুলিশের বিশেষ অভিযানে র্যাব, পুলিশের তালিকাভুক্ত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ‘মূর্তিমান আতঙ্ক’ মোফাজ্জল হোসেন চুন্নুসহ ২৩ জন গ্রেপ্তার হয়। ২২ এপ্রিল ও ২৩ এপ্রিল জেলায় ২৪ ঘন্টার মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয় ২০ মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী।
গত ২৭ মার্চ ফতুল্লার জামতলা এলাকায় সাংসদ শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানের স্ত্রী বড় ভাই জনৈক ভিকিসহ অন্যদের বিরুদ্দে সিঙ্গাপুর প্রবাসী আজিজুল গাফফার খানের জমি দখলের চেষ্টার অভিযোগে মামলা। কিছু দিন পরে এক সিএনজি ড্রাইভারের ভাঙচুর মামলায় ভিকিকে গ্রেপ্তার। ১ এপ্রিল রাতে ফতুল্লার পাগলা এলাকায় অবস্থিত মেরি অ্যান্ডারশনে ভাসমান জাহাজে পুলিশের অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ ৬৮ জনকে গ্রেপ্তার। ওই ঘটনায় এমপি শামীম ওসমানের শ্যালকে জড়ানোর ঘটনায় ব্যবপক বির্তক হয়। ১ আগস্ট নবীগঞ্জ গুদারাঘাট এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সেক্রেটারি সাইফউদ্দিন আহমেদ দুলাল প্রধান ও তার ৪ সহযোগীকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। এঘটনায় পুলিশের তথ্য ও পরিবারে তথ্যে ব্যপক ফারাক থাকায় বিভ্রাট তৈরী হয়
লাগাতার জেলা পুলশের বিশেষ অভিযান এসপি হারুনের ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জবাসীকে আশান্বিত করতে থাকে। গণমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই তার প্রসংশিত সংবাদ প্রকাশ হতে থাকে। দেয়া হতে থাকে নানা বিশেষন।
তবে, এসব কাজ করতে গিয়ে অদৃশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পরেন এসপি হারুন এক প্রভাবশালী এমপি ও তার অনুসারীদের সাথে।
অপর দিকে, বিভিন্ন পুলিশ কর্মকর্তাদের অতি বাড়াবাড়ি ও নানা দূর্নীতি সবাই বাঁকা চোখে দেখতে শুরু করেন। এর মধ্যেই কয়েকটি অভিযান, ব্যবসায়ীদের চায়ের দাওয়াত দিয়ে কিংবা আটকে রেখে, মামলা করে চাঁদা দাবির অভিযোগ এসপি হারুনের অজর্ন ম্লান করে দেয়। দীর্ঘ ১১ মাসে নারায়ণগঞ্জে নিজের যে ইমেজ তৈরী করেছিলেন, সাধারনের যেই আস্থার প্রতিক হয়েছিলেন তা যেন অতলে হারাতে থাকে।
১ অক্টোবর দিবাগত রাতে রূপগঞ্জ উপজেলার তারাব পৌরসভার রসুলপুর এলাকায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা ও ২ হাজার ইয়াবা বড়িসহ তিন ব্যক্তিকে আটকের ঘটনায় বেশ সমালোচনা সৃষ্টি হয় এসপি হারুনকে নিয়ে। ওই ব্যবসায়ীর পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় তাদের ফাঁসানো হয়েছে।
এরপর ২ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের একটি কারখানায় অভিযান চালায় গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেখানে শত কোটি টাকার নকল ইলেক্ট্রনিক্স ও প্রসাধনী সামগ্রী জব্দ করে বলে পুলিশ দাবি করেন। কিন্তু পরদিনই কারখানাটির মালিক দাবি করেন অভিযোগ মিথ্যে। তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
সর্বশেষ ১ নভেম্বর পারটেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান এমএ হাশেমের ছোট ছেলে শওকত আজিজ রাসেলের পুত্র ও স্ত্রীকে আটকের ঘটনায় ফের সমালোচনা সৃষ্টি হয় এসপি হারুনকে নিয়ে। এসপি হারুন তাদের আটকের পর দাবি করে ছিলেন ‘গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় আটক করে গাড়িটি তল্লাশি করে মাদক ও গুলি উদ্ধার করে নারায়ণগঞ্জ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এসময় রাসেলের পুত্র ও স্ত্রী গাড়িতেই ছিল। কিন্তু পরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রকাশ পায় ‘যেখানে দেখা যায় রাসেলের পুত্র ও স্ত্রীকে ঢাকার বাড়ি থেকে তুলে আনা হচ্ছে।’
তার আগে সিনহা গ্রুপের মালিকদেরও আটকে হেনস্তা ও চাদা দাবির অভিযোগ উঠে।
আর ৩ অক্টোবর পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদকে বদলী আদেশ আসে।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগের আলোচিত এমপি একে এম শামীম ওসমানের সাথে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। দুইজনই একে অপরের বিরুদ্ধে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে দেশব্যাপী আলাচিত হন। পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের পর তিনি বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেন।
পরে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যলয়ে এসে এদের ছাড়িয়ে নেন এম এ হাশেম। এঘটনায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলায় শওকত আজিজ রাসেলকে প্রধান আসামি করা হয়। এঘটনায় ২৪ ঘন্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয় এসপি হারুনকে।
এমন বিতর্কিত কর্মকান্ড ছাড়াও ২০১১ সালের ৬ জুলাই বিএনপির ডাকে হরতাল চলাকালে সংসদ ভবন এলাকায় বিএনপির সাংসদ এবং তৎকালীন চিফ হুইপ জয়নাল আবেদীন ফারুককে প্রকাশে মারধর করে আলোচনায় আসেন এসপি হারুন । এর পর বিদেশে বিপুল পরিমান অর্থ পাচারের অভিযোগে আলোচনা চলে তাকে নিয়ে।
এসপি হারুন অর রশীদ ২০১৪ সালের ২৪ আগস্ট পুলিশ সুপার হিসেবে গাজীপুরে যোগদান করেছিলেন। ২০১৬ সালে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের তৃতীয় দফায় গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কাপাসিয়ায় ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ওই বছরের ২১ এপ্রিল এসপি হারুন অর রশিদকে গাজীপুর থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর প্রত্যাহারের আদেশ তুলে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে ওই বছর ৩ মে গাজীপুরের পুলিশ সুপার পদে হিসেবে পুনর্বহাল করেন। দুই দফা মিলিয়ে ৪ বছর গাজীপুরে ছিলেন তিনি।
এসপি হারুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজ বিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করে ২০তম বিসিএস-এর মাধ্যমে ২০০১ সালে এএসপি হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগদান করেন।









Discussion about this post