নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলার অপরাধীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত মদনপুরের নানা অপরাধের হোতা কাবিলা বাহিনীর মূল হোতা বিতর্কিত খলিল মেম্বার ও তার ১১ জনের জামিন আবেদন বাতিল করে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আনিসুর রহমান।
পুলিশের উপর হামলা করে আসামী ছিনতাই, পুলিশকে মারধর ও পুলিশের বেতার যন্ত্র, অস্ত্র লুট এবং সংঘর্ষের ঘটনায় আতিকুর রহমান নামে এক যুবক হত্যার ঘটনায় দায়েক করা মামলার মূল হোতা খলিল মেম্বার ও তার আরো ১১ সহযোগি একসাথে রোববার ১৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরের আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন আবেদন করলে আদালত তাদের জামিন না মঞ্জুর করে তাদের জেলা কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন।
এই মামলার অপর আসামীদের মধ্যে মদনপুরের দূর্ধর্ষ সন্ত্রাসী ফাহাদ, দিপু, অপু, মুন্না, সুজন, কামাল হোসেন, মাইনুদ্দিন, আরিফ, মনির হোসেন ও মারুফকে একই সাথে কারাগারে পাঠায় আদালত ।
প্রসঙ্গত, মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মদনপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য খলিলুর রহমানের সঙ্গে স্থানীয় শ্রমিক নেতা আমির হোসেনের দীর্ঘদিন বিরোধ চলছিল। এর জেরে গত ১৮ নভেম্বর খলিলকে কুপিয়ে আহত করে প্রতিপক্ষের লোকজন। পরে আমিরের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে খলিলের সমর্থকরা।
জানা গেছে, গত ১২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় মদনপুরে একটি রেষ্টুরেন্ট থেকে খলিল মেম্বারের মাদক সিন্ডিকেটের নূর নবী ও রিফাত নামের ২ জনকে পুলিশ গ্রেফতার করে। এ খবর স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়লে খলিল মেম্বারের সহযোগী চাঁনপুর এলাকার মতিনের ছেলে সুজন, দিপু, মাইনুদ্দিন, সেলিম, মুকুল, হান্নান, মনির, কানা মতিন, মারুফ, আনোয়ারসহ ২৫/৩০ জন এসে পুলিশকে ঘিরে রাখে। তারা আটক দুইজনকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের উপর হামলা করে মাদক ব্যবসায়ীরা। হামলাকারীরা পুলিশের কাছ থেকে ওয়ারলেস সেট ও অস্ত্র ছিনিয়ে নেয়। পরে প্রচণ্ড চাপের মুখে রাত সাড়ে ১০ টার দিকে খলিল মেম্বার উপস্থিত থেকে পুলিশের ওয়ারলেস সেট ও অস্ত্র ফেরত দেয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে চাঁনপুর ও ফুলহর গ্রামের মদনপুর বাসস্ট্যান্ডের নেতৃত্বের লড়াইয়ে গত দেড়যুগে দুই গ্রুপের মধ্যে দুই নারীসহ ১৯ জন খুন হয়েছেন। এই দুই গ্রামের মধ্যে প্রতিনিয়ত রক্তপাত ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
মদনপুর এলাকার ভয়ঙ্কর শীর্ষ সন্ত্রাসী বাহিনীর প্রধান কামরুজামান কামু ও সুরুত আলী মারা যাওয়ার পর গত ৫-৭ বছর এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড স্তিমিত হয়ে আসে। মদনপুর এলাকার এক শিল্পপতির পৃষ্ঠপোষকতায় চাঁনপুর গ্রামের মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে কাবিলা এক সন্ত্রাসী বাহিনী গঠন করে। আস্তে আস্তে সে পরিবহন সেক্টর ও স্থানীয় রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা দোকানপাটে চাঁদাবাজি তার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়।
এসব সেক্টর থেকে প্রতিমাসে ৭০-৮০ লাখ টাকার চাঁদার ভাগ বসাতে খলিল মেম্বার চাঁনপুর এলাকায় এক বাহিনী গঠন করে। এরপর থেকে চাঁদার টাকা উত্তোলন নিয়ে দুই গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থান নেয়। এ নিয়ে খলিল ও কাবিলা গ্রুপের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। খলিল মেম্বার মদনপুর ইউনিয়ন ৫নং ওয়ার্ডে দুইবার নির্বাচিত হন। তিনি ওই ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের স্ব-ঘোষিত সভাপতি। অন্যদিকে কাবিলা বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুলের লোক বলে জানা যায়।
এলাকাবাসী জানান, গত ২০০১ সালের আগে উপজেলার মদনপুর মুরাদপুর গ্রামের কামাল উদ্দিনকে ট্রাক চাপা দিয়ে হত্যা করে প্রতিপক্ষ গ্রুপ। এ হত্যাকাণ্ডের পর থেকে কামালউদ্দিনের ছেলে কামরুজ্জামান কামু বদলা নিতে সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। এ কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিপক্ষ গ্রুপ সন্ত্রাসী কামুকে না পেয়ে তার মা ফুলবিবিকে কুপিয়ে হত্যা করে। পিতা ও মাতার হত্যার বদলা নিতে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে কামু। তার সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যোগ দেয় তার ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা, মনিরুজ্জামান মনু, বড় ভাই বাবুল আক্তার ও আবুল হোসেন। পুরো মদনপুর এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
সন্ত্রাসী আধিপত্য বিস্তার ও পরিবহন সেক্টরের চাঁদাবাজির ভাগ বসাতে প্রতিপক্ষ হিসেবে অবস্থান নেয় চাঁনপুর গ্রামের সোনা মিয়ার ছেলে সুরুত আলী। এ নিয়ে কামু বাহিনী সুরুত আলীর ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে। এরপর থেকে মদনপুর এলাকায় একের পর হত্যাকাণ্ড রক্তপাতের মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসীদের এক রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। সুরুত আলী ও কামু বাহিনীর মধ্যে পাল্টা-পাল্টি সংঘর্ষ চলে। যাকে যেখানে পাওয়া যেত সেখানেই হত্যা করা হতো। সুরুত আলী বাহিনীর হাতে কামরুজ্জামান কামুর ছোট ভাই নুরুজ্জামান নুরা ও বড় ভাই বাবুল আক্তার খুন হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের কয়েক মাস পর কামুর বোন নিলুফা বেগমকে তুলে নিয়ে হাত-পায়ের রগ কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়ে সুরুত আলী বাহিনী। এরপর কামুর আরেক বোন রেহানা বেগমকে তুলে নিয়ে লাশ টুকরা টুকরা করে নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এখনো লাশের সন্ধান মেলেনি। এভাবে কামু বাহিনীর সদস্য ঘোড়া দেলোয়ার, ফুলহরের শাহজাহান ও তার ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মাসুদকেও খুন করা হয়। সর্বশেষ খুন হয় ফুলহর গ্রামের ব্যবসায়ী রিপন। একইভাবে সুরুত আলী বাহিনীর সদস্য জুলহাস, সামছুল হক, সুমন ও তার ভাই দলিল লেখক বাতেনকে হত্যা করে কামু বাহিনী। কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন ও ফুলহর গ্রামের আলী আহম্মদের ছেলে মুকবুল পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। কামুর দুই ভাই ও দুই বোনের হত্যার প্রতিশোধ নিতে সুরুত আলীকে নয়াপুর এলাকায় প্রকাশ্যে হত্যা করে শরীর থেকে মাথা কেটে নিয়ে যায় কামুর বড় ভাই আবুল হোসেন। কামুর স্বাভাবিক মৃত্যু হলে ও সুরুত আলী নিহত হওয়ার পর মদনপুরের নেতৃত্ব চলে আসে চানপুর এলাকার মৃত ইয়াসিন মিয়ার ছেলে বিএনপির সক্রিয় নেতা কাবিল ওরফে কাবিলার হাতে। সরকারি দলের ব্যানার সাঁটিয়ে খলিল ওরফে বরিশাইল্লা খলিল মেম্বার কাবিলার স্থলাভিষিক্ত হয়।
কাবিলার পুরো বাহিনী খলিলের হয়ে কাজ করে। কাবিলা অন্তরালে থাকলেও খলিল মেম্বার মদনপুরের পরিবহন সেক্টরে চাঁদাবাজি, মাদক পাচার ও বিক্রির সিন্ডিকেট, ডাকাতির একটি দলও গঠন করে। পুলিশের উপর হামলা চালিয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর স্বর্ণের দোকানে লুটপাট করে প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায় খলিল বাহিনী। এর পর খলিল বাহিনী ও আমির বাহিনী মদনপুর এলাকায় একছত্র আধিপত্য বিস্তার করে। এই দুই বাহিনীর পরিবহন সেক্টর দখলকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস যাবত সংঘর্ষ চলছিল। সর্বশেষ দুই বাহিনীর দ্বন্দ্বের জের হিসেবে দুই পক্ষের সংঘর্ষকালে গার্মেন্ট শ্রমিক আশিকুর রহমান গুলিতে নিহত হয়।
সংঘর্ষের মধ্যে পুলিশের এসআই মোহাম্মদ আলী, কনস্টেবল দেবাশীষ, কনস্টেল মনোয়ার, মোহনসহ ১৫ জন আহত হন। পরে অতিরিক্ত পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং রিফাত ও নুরনবী নামে দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। এতোদিন অপরাধী চক্রের সকলেই প্রশাসনের বিভিন্ন অসাধু কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এলাকায় রাম রাজত্ব চালিয়ে আসছিলো বলে অভিযোগ করে মদনপুরের অসংখ্য ভূক্তভোগি ।









Discussion about this post