নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনি, তনু হত্যাকাণ্ড ও বিএনপিসহ জামায়াত ইসলামীর সাথে যোগসাজসের অভিযোগ তুলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডাঃ সেলিনা হায়াত আইভীর সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছেন নারায়ণগঞ্জ সচেতন নাগরিক সমাজ নামের একটি সংগঠন ।
মঙ্গলবার (১৯ মার্চ) দুপুরে জেলা প্রশাসক রাব্বী মিয়ার কাছে সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল এবং জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি এডভোকেট হাসান ফেরদৌস জুয়েলসহ জেলা আওয়ামীলীগের একাংশের নেতাদের উপস্থিতিতে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয় ।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সংগঠন জেলা আইনজীবি সমিতি, জাতীয়ভিত্তিক বিভিন্ন সংগঠন, জেলা শিক্ষক সমিতি, স্বাচিপ, বিএমএ, জেলা ও বিভিন্ন থানা পূজা উদযাপন কমিটি, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব, নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাব, ব্যাংক এ্যামপ্লয়ীজ সমিতি, জেলা পরিষদ সদস্য, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, বিভিন্ন মসজিদের ইমাম সংগঠন, জেলার বিভিন্ন প্রেসক্লাব ও জেলা ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটিসহ নারায়ণগঞ্জের ২১টি নাগরিক সংগঠনের পক্ষ থেকে এ স্মারকলিপি প্রদান করা হয়। স্মারকলিপির সাথে এসব সংগঠনের কর্মকর্তা ও সদস্যদের গণস্বাক্ষরের অনুলিপিও সংযুক্ত করা হয়েছে । পাশাপাশি মেয়র আইভীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে বিভিন্ন অডিও ভিডিও ফুটেজ তথ্য প্রমাণাদি হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।
স্মারকলিপি জমা দেওয়ার সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা, সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শিরিন বেগম, মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসরাত জাহান খান স্মৃতি, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর কৃষকলীগের সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান লিটন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আজিজুর রহমান, মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান সুজন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
স্মারকলিপি জমা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী, মহান জাতীয় সংসদে আপনার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত (মরণোত্তর) প্রয়াত একেএম সামসুজ্জোহা ও ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ গ্রহণ এবং ’৭৫-পরবর্তী সময়ের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাতে নারায়ণগঞ্জবাসী গর্বিত ও সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি, নারায়ণগঞ্জে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলেই একটি জনবিচ্ছিন্ন শ্রেণী এই পরিবারটিকে টার্গেট করে মাঠে নামে এবং বিভিন্ন আপত্তিকর বক্তব্য দিতে শুরু করে। সংবিধানের বাহক সেজে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে আঁতাত করা ক্ষমতার জন্য লালায়িত কিছু বড় বড় ডক্টর সাহেবের প্রেসক্রিপশনে ঘন ঘন রাজধানী থেকে তথাকথিত কিছু সুশীল নারায়ণগঞ্জে আসছেন। পরিতাপ হয়, ক্ষোভ হয় যখন দেখি যার আহবান ও সমর্থনে এসব সুশীলরা আসেন, তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী।’
‘সাম্প্রতিক সময়ে আমরা লক্ষ্য করলাম গত ৬ মার্চ মেয়র আইভী জনসম্মুখে বললেন, নারায়ণগঞ্জে আজ পর্যন্ত যত খুন হয়েছে সবই ওসমান পরিবারের দ্বারা হয়েছে। আমরা স্তম্ভিত হলাম। আমরা আরও অবাক হলাম যখন শুনলাম মেয়র আইভী বলছেন, ‘সাগর-রুনির ব্যাপারে আমরা অনেক কিছুই জানি, অনেক কিছু জড়িত, তনু হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না, সেটাও জানি কারা জড়িত’। শুধু তাই নয়, মেয়র আইভীর উপস্থিতিতে ভাড়া করে আনা সুশীল ও তার সঙ্গে থাকা জনবিচ্ছিন্ন গুটিকয়েক লোক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যেসব মিথ্যাচার ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন, তাতে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। নারায়ণগঞ্জের সর্বমহলে একটিই প্রশ্ন, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের নেত্রী ও দলীয় মেয়র হয়ে আইভীর এমন বক্তব্য ও সুশীলদের প্রতি তার এতোটা নগ্ন সমর্থন কেন ?’
‘যুদ্ধাপরাধী আলবদর প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ সহচর, জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শুরার সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জেলার আমির মাওলানা মঈনুদ্দিন গত বছরের ২০ অক্টোবর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর একটি জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সেখানে জামায়াত আমির অবলীলায় স্বীকার করেছেন- বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত মেয়র আইভীকে কিভাবে, কী কৌশলে জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এর মূল কারণ পারিবারিকভাবে জামায়াতের সঙ্গে মেয়র আইভীর সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। ওই জবানবন্দিতে পরিষ্কারভাবে জামায়াতের আমির বলেছেন, প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আগে থেকেই আইভীর সঙ্গে খালেদা জিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটা হয়।
খালেদা জিয়ার সঙ্গে সমঝোতা ছিল নির্বাচনের পর বিএনপিতে যোগ দেবেন আইভী। এই শর্তেই বিএনপির প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে গভীর রাতে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু জামায়াত চেয়েছিল আইভী যেন আওয়ামী লীগেই থাকেন। নিজের জবানবন্দিতে জামায়াত আমির বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াতের পক্ষে শামীম ওসমানকে ঠেকানো সম্ভব নয়, তাই আইভীকে আওয়ামী লীগই করতে হবে। তাকে আওয়ামী লীগে রাখতে পারলেই ভালো। এতে বিএনপি-জামায়াত সবার জন্য সুবিধা আছে’। জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘রিলেশনটা ওপেন হলে সমস্যা। আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ আছে। আমরাও চাই না আইভীকে বিব্রত করতে। আমাদের যে কোনো কাজে অনুরোধ করলে ডাইরেক্ট, ইনডাইরেক্ট তিনি বসে সহজে করে দিয়েছেন। অনেক কাজ করে দিয়েছেন’। ওই জবানবন্দিতে আরও যে ভয়ঙ্কর তথ্য দেওয়া হয়েছে তা হলো, যে সময় পুরো দেশ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে উত্তাল, সেসময় মেয়র আইভী যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের পরিবারকে অতি গোপনে জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছেন। জামায়াতের আমিরের দেওয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, ‘মুজাহিদ সাহেবের ওয়াইফ আর আইভী ক্লাসমেট ছিলেন। মুজাহিদ সাহেব যখন জেলে, তখন তার ছেলেদের জন্মনিবন্ধনও এখানেই হয়েছে। অনেক ঘোরাঘুরি করে যখন পাচ্ছিলেন না, তখন মুজাহিদের ওয়াইফ আইভীকে বলার পরই আধঘণ্টার মধ্যে এই জন্মনিবন্ধন হয়ে গেলো’।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল বলেন, ‘উল্লিখিত ঘটনা ও আইভীর বক্তব্য প্রমাণ করে দলে জামায়াতের এজেন্ট কে বা কারা। জামায়াতের আমিরের দেওয়া সেই জবানবন্দির প্রতিটি কথাই মিলে যাচ্ছে তার কর্মকাণ্ডে। ফলে আমরা চরমভাবে শঙ্কিত ও আশঙ্কা করছি যে, নারায়ণগঞ্জে আবারও অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ২০০১-এর ১৬ই জুনের বোমা হামলার মতো আবারও কোনো পৈশাচিক ঘটনার পরিকল্পনা হচ্ছে কি?’
‘সরকারকে সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে সাগর-রুনি ও তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে মেয়র আইভীর বক্তব্যে আমাদেরও জিজ্ঞাসা, আসলে তিনি সাগর-রুনি ও তনু হত্যাকাণ্ড নিয়ে এমন কী জানেন? পাশাপাশি ওসমান পরিবারকে খুনি পরিবার আখ্যা দেওয়ার নেপথ্যে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত এবং সেই ক্ষমতার জন্য লালায়িত তথাকথিত ডক্টর সাহেবদের প্রেসকিপশন রয়েছে, তা অনেকটাই স্পষ্ট। একইসঙ্গে ঐতিহ্যবাহী এই পরিবারকে আঘাত করে স্বাধীনতার চেতনায় আঘাত করা হচ্ছে, আপনার দলের ক্ষতি সাধন করা হচ্ছে।’ বলেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি জুয়েল।









Discussion about this post