প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাত নারায়ণগঞ্জের শহুরে জীবন বহুকাল ধরে বড্ড এক ঘেয়েমি ছিল। কোথাও দম ফেলার জন্য এক টুকরো জায়গা পাচ্ছিল না ইট পাথরের অট্টালিকায় ঘেরা ব্যস্ত নগরবাসী। বিকেলে কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার সময় কোথাও একটু বিনোদনের জায়গার অভাবে যন্ত্রমানবে পরিণত হচ্ছিল শহরের মানুষগুলো।
সেই শহুরে যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি দূর করতে ভরসা ছিল জেলার বাইরের কোনো বিনোদন কেন্দ্র। যা ছিল ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। তবে নারায়ণগঞ্জবাসীর সেই আক্ষেপ এখন কিছুটা হলেও পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন নগর মাতা সেলিনা হায়াৎ আইভী।
শহরের ব্যস্ততম জায়গা ২নং রেল গেইট এলাকায় নির্মাণ করে দিয়েছেন দম ফেলার জায়গা। গাছ লতাপাতায় ঘেরা সেই জায়গায় বিকেল হলেই ক্লান্তি দূর করতে ছুটে আসছেন নগরবাসী।
শহরের বঙ্গবন্ধু সড়কের ২নং রেল গেইট এলাকায় নির্মিত ‘বঙ্গবন্ধু চত্ত্বর’ ঘুরে দেখা যায় মনোরম সেই দৃশ্য। প্রধান সড়ক থেকে ভেতর শেষ প্রান্ত পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে হাঁটার রাস্তা। দক্ষিণ পাশে নির্মাণ করা হয়েছে বৃক্ষশোভিত কংক্রিটের বসার স্থান। উত্তর পাশে নির্মাণ করা হয়েছে দুইটি উন্মুক্ত মঞ্চ। চত্ত্বরের ঠিক পশ্চিম দিকে শোভা পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় সম্বলিত ফলক ও তারঁ প্রতিমূর্তি। বঙ্গবন্ধু চত্ত্বরটির সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ এখনো চলছে। তবে এখনি চোখ জুড়িয়ে যায়। যেন শহরের বুকে একটুকরো সবুজের সমারহ। তাই চত্ত্বরের কাজ শেষ হওয়ার আগেই প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে ভীড় জমাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।
সহকর্মীর সাথে এখানে বসে একটু বিশ্রাম নিতে আসেন মো. ফিরোজ। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সেল্সম্যান। প্রতিষ্ঠানের পন্য বিক্রির টার্গেট পূরণ করতে সারাদিন শহর চষে এখন ক্লান্ত। এখন অফিসে গিয়ে বিক্রির হিসাব জমা দেওয়ার আগে সহকর্মীর সাথে এখানে এসে বসেছেন। সারাদিনের ক্লান্তি একটু দূর হলেই তিনি আবার অফিসে গিয়ে হিসাব বুঝিয়ে দিতে যাবেন।
মি. ফিরোজ বলেন, ‘চাকরির কারণে সারাদিন শহরে দৌঁড়াদৌড়ি করতে হয়। যে কারণে দিন শেষে খুব ক্লান্তি লাগে। শহরে যদি কোথাও বসে ক্লান্তি দূর করতে না পারা যায় তাহলে শরীরটাকে যান্ত্রিক মনে হয়। যান্ত্রিকতা কাটাতে একটু বসে জিরিয়ে নেওয়ার জায়গা খুব বেশি প্রয়োজন হয়। সেই প্রয়োজন মেটানোর জন্য এরকম জায়গার কোনো তুলনা হয় না।’
তিনি আরো বলেন, ‘এই শহরে প্রায় ৭ বছর ধরে চাকরি করি। কিন্তু সকালে শহরে এসে কিংবা বিকেলে একটু বসে বিশ্রামের মত কোনো জায়গা ছিল না। বেশির ভাগ সময় চাষাঢ়া শহীদ মিনারে বসে একটু আড্ডা দিতাম। কিন্তু সেখানেও প্রচুর মানুষের ভীড় থাকতো। যে কারণে সেখানে খুব বেশি ভালো লাগতো না। কিন্তু এখন এক এক করে শহরে দম ফেলার জায়গা করা হচ্ছে। শেখ রাসেল পার্ক হলো, এখানে বসার জায়গা বানানো হয়েছে। শীতলক্ষ্যার পাড়েও এখন বেশ মনোরম জায়গা বানানো হয়েছে। ধীরে ধীরে শহরে সবুজায়ন ফিরে আসছে। ব্যস্ত জীবনে কিছুটা হলেও এখন সস্তিতে সময় কাটাতে পারছি।’
জানা যায়, ১৯৪৩ সালে এই জায়গাটিতে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রহমতউল্লাহ মুসলিম ইনস্টিটিউট ভবন নির্মাণ করা হয়। পরবর্তিতে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে রহমতউল্লাহ ইনস্টিটিউটের পুরনো ভবনটি ভাঙার অনেক আগেই তৎকালীন পৌরসভার মাধ্যমে পাশেই ২৪ শতাংশ জায়গার উপর রহমতউল্লাহ মুসলিম ইন্সটিটিউটের জন্য একটি বহুতল ভবন নির্মাণ করে দিয়েছে। তবে পুরনো ভবনটিতে অবৈধভাবে দখল করে দির্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছিল একশ্রেনির ব্যবসায়ীরা। এতে নগরবাসী যেমন বঞ্চিত হচ্ছিল তেমনি এই জায়গাটিকে ব্যবহার করে লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল কতিপয় মানুষ।
বার বার সময় দেওয়ার পরেও যখন জায়গাটি ছেড়ে দিচ্ছিল না। তখন বাধ্য হয়ে ভবনটিকে ভেঙ্গে দেয় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন। এরপর সেখানে ‘বঙ্গবন্ধু চত্বর’ নির্মাণের ঘোষণা দেন নাসিক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এছাড়া সবুজায়নের জন্য জায়গাটির চারপাশে গাছ লাগানোর ঘোষণাও দেন তিনি।
সেই ঘোষণার পর ১৭ মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শত বার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবসে বঙ্গবন্ধু চত্ত্বরের উদ্বোধন করেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এরপর থেকে এখনো এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধু চত্বরের সৌন্দর্য বর্ধণের কাজ।









Discussion about this post