একদিকে আইনশৃংখলা বাহিনীর অভিযান আরেক দিকে জ্বালানী ডিপোর কর্মকর্তাদের যোগসাজসে চলছে তেল চুরির মহাযজ্ঞ । অবিরামভাবেই চলছে এই অপকর্ম । প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, ডিপোর প্রায় সকল কর্মকর্তা, থানা পুলিশের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ছাড়াও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ এবং বিশেষ পেশার কয়েকজন নিয়মিত চোরাই তেলের কারবার থেকে মাসোয়ারা আদায় করে যাচ্ছে ।
তাই চোরাই কারবারীদের বিশাল এই সিন্ডিকেট নির্মূল করা কঠিন
নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট :
জ্বালানী তেল চোরদের গ্রেফতারের নামে সাড়াসী অভিযানকে নাটক বলে মন্তব্য করছে এলাকার সাধারণ মানুষ । তেলচোরচক্রের হোতারা এতটাই ধুরন্ধর যে তারা হাজারো মামরা মোকদ্দমা থাকার পরও নারায়ণগঞ্জের তেল চোরদের টিকিটও স্পর্শও করতে পারে নাই কেউ । পুলিশ হত্যা করেও এই চক্রের হোতাদের অনেকেই বিশাল টাকার বিনিময়ে চাঞ্চল্যকর মফিজ হত্যা মামলা থেকে রেহাই পেয়েছে হত্যাকারীরা । এতো কিছুর পরও চোরাকারবারীরা তাদের কর্মকান্ডঅব্যাহত রেখেছে বিরামহীনভাবে ।
রোববার সকাল থেকে এ রিপোর্ট লেখাকালীন পর্যন্ত ডিপোর আশেপাশে থেকে চোরাই তেলের কারবার এখনো অব্যাহত রেখেছে এই অপরাধীরা । অথচ এদের খুজে রেড়ানোর ঘটনাকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছে এলাকার অনেক সাধারণ মানুষ ।
জানা যায়, ২৭ আগস্ট রাতে সিদ্ধিরগঞ্জের এসও রোড এলাকায় স্বপন মন্ডলের আস্তানায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমানের চোরাই তেলসহ ২ সহযোগিকে গ্রেফতার করে র্যাব। এ ঘটনায় র্যাব বাদি হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় পলাতক আসামী করা হয়েছে এসও রোড এলাকার চোরাই তেল কারবারীদের মূলহোতা এম এ স্বপন ওরফে স্বপন মন্ডলকে। স্বপন মন্ডল নাসিক সিদ্ধিরগঞ্জের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের চাচাতো ভাই এবং তার সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম একজন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের শেল্টারে এসও রোড এলাকার চোরাই তেলের কারবার নিয়ন্ত্রন করে আসছিল এম এ স্বপন ওরফে স্বপন মন্ডল। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের সাথে সাবেক কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম মন্ডলের গভীর সম্পর্ক থাকায় এলাকায় প্রকাশ্যে থাকলেও ৫ দিনেও গ্রেফতার হননি স্বপন মন্ডল।
মামলা সূত্রে জানা যায়, গত ২৭ আগষ্ট রাতে গোদনাইল এসও এলাকায় স্বপন মন্ডলের চোরাই জ্বালানী তেলের আস্তানা থেকে মোঃ ইমাম হোসেন (৩৫) ও মোঃ শফিকুল ইসলামকে (৪৬) গ্রেফতার করে র্যাব। এসময় নাসিক ৬নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সিরাজ মন্ডলের সহযোগীদের মধ্যে অন্যতম এম এ স্বপন ওরফে স্বপন মন্ডল (৪০) কৌশলে পালিয়ে যায়।
এজহারে উল্লেখ করা হয়, পলাতক আসামী এম এ স্বপন ওরফে স্বপন মন্ডলসহ গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন যাবৎ অবৈধ চোরাই জ্বালানী তেল এটিএফ জেট ফুয়েল) নিজেরা মজুদ রেখে কেনাবেচা করে আসছিল। গ্রেফতারকৃত ও পলাতক আসামীরা অভ্যাাসগতভাবে পরস্পর যোগসাজসে বিভিন্ন কৌশলে অবৈধ উপায়ে জ্বালানী তেল সংগ্রহ এবং মজুদ করে অবৈধভাবে কেনাবেচা করে আসছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করে। আসামীদের স্বীকারোক্তি মতে ৫টি লোহার ড্রামে ভর্তি মোট ১ হাজার পঞ্চাশ লিটার জেট ফুয়েল যার আনুমানিক মূল্য ৭৫ হাজার ৬’শ টাকা জব্দ করা হয় । এছাড়া পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত ১টি পিকআপ ভ্যান (ঢাকা মেট্রো ন ১৬-৩৯০৩) ধৃত আসমী মোঃ ইমাম হোসেনের কাছ থেকে তেল বিক্রির নগদ ৫৫ হাজার ৯০ টাকা জব্দ করা হয়।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) মোঃ আজিজুল হক জানান, যত বড় ক্ষমতাশালীই হোক না কেন ? পুলিশ তাদের ছাড় দিবে না । এম এ স্বপন ওরফে স্বপন মন্ডলের বিরুদ্ধে চোরাই তেল ব্যবসার অভিযোগে মামলা করেছে র্যাব। তাকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে।
স্থানীয় সূত্রে আরো জানা যায়, গোদনাইল ও কুর্মিটোলা ডিপোর কর্মকর্তা এবং প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলছে বিমানের তেল চুরির রমরমা বাণিজ্য। পল্টি ব্যবসা হিসেবে পরিচিত চোরাই তেলের ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারের জন্য একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। চোরাই তেল ব্যবসায়ীরাই এসব সন্ত্রাসী লালন পালন করছে । তেল চুরি চাঙ্গা রাখতে গোদনাইলে বিভিন্ন নামে তেল চোরদের একাধিক সংগঠন গড়ে তুলা হয়েছে। বড় বড় তেল চোররাই এসব সংগঠনের নেতা। তেমনি একটি সংগঠন বাংলাদেশ ট্যাংক লরী অনার্স এসোসিয়েশন গোদনাইল শাখা । যার সভাপতি আনোয়ার হোসেন মেহেদী। গোদনাইল ২ নং ঢাকেশ্বরী মিলের সাধারণ একজন শ্রমিক বার্মাশীল এলাকার মৃত আফির উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন মেহেদী। দুই বোন ও ৬ ভাইয়ের মধ্যে মেহেদী চতুর্থ। অভাবের তাড়নায় এক সময় চাচাতো ভাই শাহিনের বাড়িতে কাজের ছেলে হিসেবে কাজ করতো মেহেদী। ওই বাড়ীতে কাজ করেছে টানা ৫ বছর । অথচ এখন কোটি কোটি টাকার মালিক মেহেদীর কাজ করছে বহু কর্মচারী।
আলাদীনের চেরাগ পাওয়ার মত স্বশিক্ষিত মেহেদী তেল চুরিতে জড়িয়ে রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। মেহেদী কোটি পতি বনার আড়ালে রয়েছে তেল চুরিসহ নানা অপকর্ম । আনোয়ার হোসেন মেহেদীসহ আরো কয়েকজন শীর্ষ তেল চোরাকারবারী তাদের নিজস্ব ট্যাংকলরী দিয়ে বিমানের তেল সরবরাহ করছে। তেল চোরদের গডফাদার মেহেদী এখন তার ছেলা চামচাদের কাছে ব্যবসা বুঝিয়ে দিয়ে বেশীরভাগ সময় ঢাকায় আমোদ ফুর্তি করে দিন কাটাচ্ছে। মেহেদী ছাড়াও বার্মাশীল এলাকার জসিম, আলমগীর, জাহিদসহ পদ্মা ডিপো থেকে বের হওয়ার পর ১ কিলোমিটার পর্যন্ত এলাকায় মোঃ শাহ জালাল, শাহ আলম, বাচ্চু, রুবেল, নূরা, হাফেজ, রমজান, আমির হোসেন প্রধান, জাহাঙ্গীর, মামুন, মারুফ, মজিবুর, সিরাজ ভান্ডারী, আরিফ, সালেহ আহম্মদ, মোক্তার, নূর আলম, সিরাজ, খোকা, নূরুল হক, আলামিন ভূঁইয়া, শহিদ ভূঁইয়া, জাহাঙ্গীর, শাজাহান, দুইক্ষ্যা বাবুল, সায়েদ আলী, আকরাম, মানিক, জালাল, হিন্দু বাচ্চু, কবির ভূঁইয়া, আউয়াল, রিপন, জুয়েল, কাশেম, ফয়সাল, অহিদ, মাইন্যা শাহিন, নাইম, ওয়াসিম, রমজান, টিটু ও রনির তেল চুরির আস্তানা রয়েছে।
এসব আস্তানাকে স্থানীয়ভাবে ‘পল্টি ঘর’ বলা হয়। এছাড়াও এসও এলাকায় মেঘনা ডিপোকে ঘিরেও ঘড়ে উঠেছে তেল চোর চক্র । এস.এম আসলাম ওরফে ফুর্তি আসলাম, আশরাফসহ অর্ধ শতাধিক তেল চোর এসও এলাকাতেও রয়েছে। বিমানের তেল ছাড়াও পদ্মা ও মেঘনা ডিপোকে ঘিরে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার তেল চুরি হচ্ছে। এসব তেল চোরাকারবারীদের মধ্যে অনেকেই এক সময় ছিল টোকাই। ওই সব টোকাইরাও এখন কোটি পতি বনে গেছে বলে স্থানীয়রা জানায়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ চোরাই তেল ব্যবসায়ী পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন থেকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল কেনাবেচার লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে। তারা এসব লাইসেন্স দিয়ে ডিপো থেকে পেট্রোল ও অকটেন কিনে তাদের পল্টি ঘরে বেচাকেনা করছে। চক্রটি বিমানে চোরাই তেল পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের সাথে মিশিয়ে বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পগুলোতেও সরবরাহ করছে। অন্যান্য জ্বালানি তেলের চেয়ে বিমানের তেলের দাম অনেক কম হওয়ায় চোরাকারবারীরা ভেজাল করছে। সূত্রটি জানায়, চোরাকারবারীরা ৪৫ টাকা দরে বিমানের তেল কিনে অকটেনের সাথে মিশিয়ে ৮৫ টাকা লিটার বিক্রি করে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ট্যাংক লরি চালক জানায়, চুরি করে তেল বিক্রি করা ছাড়া চালক হেলপারদের কোন উপায় নেই। কারণ ট্যাংকলরি মালিকরা আমাদের কোন বেতন দেয় না। তাছাড়া টাকা না দিলে কুর্মিটোলা ডিপোতে তেল বুঝে রাখার সময় কম দেখানো হয়। কম হলেও টাকা দিলে কোন সমস্য হয় না।
এ ব্যাপারে গোদনাইল মেঘনা ডিপোর ব্যবস্থাপক লুৎফর রহমানের মুঠোফোনে অসংখ্যবার ফোন করে এবং ম্যাসেজ পাঠিয়ে মন্তব্য নেয়ার চেষ্টা করলেও কোন প্রতিউত্তর না দেয়ায় রমরমা তেল চুরির বিষয়ে কোন সুনিদিষ্ট মন্তব্য পাওয়া যায় নাই ।









Discussion about this post