বন্দর উপজেলা নির্বাচনের পর অনেকেই কঠোর সমালোচনা করে বলেন, “সবই রাজনৈতিক চক্রান্ত। চলছে নতুন নতুন নাটক মঞ্চায়ন। নারায়ণগঞ্জ সদর আসনে একজন প্রভাবশালী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য। যাদের ভয়ে বাঘে মহিষে এক ঘাটে জল খায়। সেই আসনের এই উপজেলায় অপর মুক্তিযোদ্ধাকে পরাজিত করে বন্দরের অন্যতম রাজাকার পরিবারের সদস্য মাকসুদ এক প্রকার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে উপজেরা চেয়ারম্যানের পদ ছিনিয়ে নেয়। বিচিত্র নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পরিবেশে এমন কর্মকান্ডকে পুরো জেলাবাসী ই রাজাকারপুত্রের এমন জয়লাভ কে নতুন নতুন রাজনৈতিক নাটক মঞ্চায়ন হচ্ছে ।“
অনেকেই রাজাকারের এই পরিবারকে “ফ্রাংকেনস্টাইন” বলে মন্তব্য করেছেন। মুক্তিযোদ্ধাকে পরাজিত করে মাকসুদ নির্বাচনের পর এবার সেই মাকসুদপুত্র নানা অপরাধের হোতা মাহমুদুল হাসান শুভ বন্দর উপজেলা মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান হিসেবে অধিষ্ঠিত করতে সেই নাটকের মতোই সকল পরিকল্পনা চালিয়ে যাচ্ছে।
‘আগামীতে হয়তো এই সদর আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে রাজাকারপুত্র নতুন রূপে আবির্ভাব ঘটবে। সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করতেও মানষিকভাকে প্রস্তুতি নিচ্ছে মাকসুদ ৷’ এমন মন্তব্য বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ সূত্রের ।
বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আগামী ২৭ জুলাই।
বন্দর উপজেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মাকসুদ হোসেন এই ইউপির চেয়ারম্যান ছিলেন।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিতে মুছাপুর ইউপি চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। এবার মুছাপুর ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাঁর ছেলে মাহমুদুল হাসান শুভ। মনোনয়নপত্র কিনেছেন উপজেলা চেয়ারম্যানের স্ত্রীও।
এদিকে, এ নিয়ে চটেছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান। গত মঙ্গলবার (৯ জুলাই) বন্দর ইউনিয়নের একটি পার্কে অনুষ্ঠিত এক আলোচনা সভায় ক্ষোভ ঝারেন তিনি। এই সময় মুছাপুর ইউপি নির্বাচনে প্রশাসনের কাউকে ‘নাক গলাতে’ নিষেধও করেছেন তিনি।
এর আগে গত ৯ জুন সেলিম ওসমান বন্দর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটার ও প্রশাসনের লোকজন আর্থিক সুবিধা নিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী মাকসুদ হোসেনকে বিজয়ী করেছেন বলে অভিযোগ করেন।
মঙ্গলবারের অনুষ্ঠানে সেলিম ওসমান বলেন, ‘প্রশাসনকে অনুরোধ করবো, এই নির্বাচনের মধ্যে কোনো অবস্থায় নাক গলাতে আসবেন না। সাংবাদিকদের কাছে অনুরোধ করবো, প্রতিটি কেন্দ্রে যতক্ষণ ভোট হবে ততক্ষণ ক্যামেরা চলবে। প্রয়োজনে ভেতরে বাইরে দুই জায়গায়ই ক্যামেরা চলবে। নির্বাচন করবেন নাকি ছাইড়া দিবেন ? ছাইড়া দিলে ছাইড়া দেন।’
মাকসুদ হোসেনের পরিবারের সদস্যদের এই নির্বাচন থেকে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধও জানান এই সংসদ সদস্য।
তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বন্ধ করার জন্য ইতোমধ্যে কয়েকটা মামলা হাইকোর্টে পেশ করা হইছে। আমি ধৈর্য ধারণ করতে অনুরোধ করছি। এবং মাকসুদকেও অনুরোধ করছি, শান্তি ফিরিয়ে আনো। অশান্তি করবা, কেঁচো খুড়তে গিয়ে সাপ বের করে নিয়ে আইসো না। যতক্ষণ আমার জীবন চলবে ততক্ষণ আমার পাঁচটা ইউনিয়নের উন্নয়ন চলবে। আমার শত্রু থাকলেও চলবে।’
‘মানুষের কল্যাণের জন্য কেউ জনপ্রতিনিধি হইলে আমি তার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করতে রাজি আছি। গতবারের উপজেলা নির্বাচনে (বন্দর উপজেলা) কিন্তু পয়সার খেলা হইছে। আমরা দুধ খাই না। কে কত টাকা কোথায় খরচ করেছে, কোন মসজিদে কত টাকা দিয়েছে, কার কত টাকা ডিক্লারেশন ছিল…সময় কথা বলবে’, যোগ করেন তিনি।
তিনি চাইলে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ভোটকেন্দ্র দখল করে পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য।
সেলিম ওসমান বলেন, ‘আমরা নির্বাচনে ভোট দখল করি নাই। আমি চাইলে সেলিম ওসমানের কথায় সারা নারায়ণগঞ্জ থেকে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, কেউ বাকি থাকতো না, প্রত্যেকটা বুথ দখল করেই ইলেকশন করা যাইতো।’
মুছাপুর ইউপি নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এত হৈ-চৈ করে কেন নির্বাচন করবেন? এখানে তিনজন ক্যান্ডিডেট আছে আর ওদের বাড়ির তিনজন ক্যান্ডিডেট আছে। মুছাপুরবাসী আপনারা যদি সমর্থন না দেন তাহলে এরা কেন নির্বাচন করতে যাবে? পয়সার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। নমিনেশন পেপার কিনতে যাওয়ার সময় পাহারা দেওয়া হয়েছে। আমরা তো এখনও কিছু বলি নাই। মুছাপুরের সবাই আমার আপন মানুষ, ভয় থাকলে নির্বাচন করার দরকার নাই। নাহলে ওই চেয়ারম্যানের কথাই ঠিক থাকুক, বাপে-পুতেই মুছাপুর চালাক। আপনারা সিদ্ধান্ত দিলে নির্বাচন হবে, অন্যথায় নির্বাচন হবে না। আমি তাহলে পাঁচটা ইউনিয়ন না, চারটা ইউনিয়ন নিয়ে কাজ করবো।’
মাকসুদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘১২ কোটি টাকার ঊর্ধ্বে এই নির্বাচনে খরচ করা হয়েছে। এই টাকাটা আসলো কোথা থেকে? এখন ছেলেকে নামানো হইছে। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যানকে রিকোয়েস্ট করবো, পরিবারতন্ত্র তৈরি কইরেন না, আপনি বিপদে পড়ে যাইবেন। আপনার পোলা এত ভালো না। আপনারে বেঁইচা ফেলবে। আইন অনুযায়ী নির্বাচন করেন। পয়সা দিয়ে ওকে কিনবেন তাকে কিনবেন? কেনার দিন শেষ। মনে রাখবেন, লাঠির কাছে এমএ পাশ নাই। মাইরের উপর ওষুধ নাই।’
সেলিম ওসমান বলেন, ‘আপনি আপনার ছেলে, বউ, শালারে (শ্যালক) দিছেন। বন্দরের মানুষ এত বোকা না আর সেলিম ওসমানও বোকা না। খোঁচাইয়েন না, কেউচ্চা (কেঁচো) বাইর হইছে, সাপ এখনও বের হয় নাই। আগামীকাল সময় আছে উইথড্রো করার। অনুরোধ করলাম, নির্বাচন বন্ধ করেন। এই নির্বাচনের ঝঞ্ঝাট না করে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনেন।’
উল্লেখ্য, গত ৮ মে বন্দর উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের দুই সংসদ সদস্য শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের প্রবল বিরোধীতা উপেক্ষা করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন জেলা জাতীয় পার্টির সহ সভাপতি মাকসুদ হোসেন। এই নির্বাচনে ওই দুই সংসদ সদস্যের পছন্দের প্রার্থী ছিলেন সদ্য সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এমএ রশিদ।
উপজেলা নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীর পরাজয়ে নাখোশ সেলিম ওসমান ভোটের কয়েকদিন পর ৯ জুন বন্দর উপজেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, ‘বন্দরের মানুষ রাজাকারের কাছে বিকিয়ে গেছেন। বন্দরের মানুষ অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার উপর যতই রাগ করেন না কেন, পয়সার বিনিময়ে আপনারা বিকিয়ে গেছেন। রাজাকারের কাছে বিকিয়ে গেছেন। আপনারা (ভোটার) টাকা খেয়েছেন, প্রশাসনের লোকজন টাকা খেয়েছেন।’
এরপর উপজেলা পরিষদের দু’টি সভায়ও অনুপস্থিত ছিলেন সেলিম ওসমান। অনুপস্থিত ছিলেন তার অনুসারী চার ইউপি চেয়ারম্যানও। এমনকি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণের দিনও তাদের দেখা যায়নি।









Discussion about this post