আরব্য উপন্যাসের আলাদিনের চেরাগ (প্রদীপ) অনেকের কাছেই পরিচিত। জাদুকরী সেই চেরাগে ঘঁষা দিলেই দৈত্য বেরিয়ে এসে পূরণ করে মানুষের ইচ্ছা। আরব্য উপন্যাসের এই গল্প অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে টেলিভিশন সিরিয়াল, চলচ্চিত্র। গল্পের সেই চেরাগ যে বাস্তবে খুঁজে পাওয়া যাবে না, সেটাও সবার জানা।তেমনি এক আরব্য কাল্পনিক চেরাগের নাম নারায়ণগঞ্জের ওসমান পরিবার।
ওসমান পরিবার যেন সেই আরব্য উপন্যাসকে যেন হার মানিয়েছেন। বাবা ছিলেন ভ্যান আবার রিকশা চালিয়ে ছোট্ট পরিবার নিয়েই সুখেই ছিলো। আর একমাত্র পুত্র কার্টুনের টোকাই। শহেরর নয়ামাটি ও উকিল পাড়ায় ফেলে দেয়া কার্টুন কুড়িয়ে তেমন আুপার্জন করতে না পারলেও নিজের পকেট খরচটা চলতো কোন মতো ।বেকার বলাও যা্য় না আবার কোন কর্ম করে জীবিকা নির্বাহ করে তাও বলা যায় না। বাবা রিকশা চালিয়ে যতটুকু আয় তা দিয়েই কোনো মতে ডাল-ভাত খেয়ে, পরে দিন কাটছিল তাদের। কিন্তু সেই ভবঘুরে ছেলেটা এখন কোটি কোটি টাকার মালিক ! তার বাড়ি পাহারা দিতে দিনরাত শ্রম দিচ্ছে একদল মানুষ !
ফলে ৫ আগস্ট থেকে অদ্যবধি তার বাড়িতে একটি ঢিল ছোড়ারও সাহস করেনি কেউ। অবশ্য যারা ঢিল ছোড়বে তারাই নাকি তার বাড়ি রক্ষা করতে পাহারা দিচ্ছেন দিনরাত। এ জন্য অবশ্য মোটা অঙ্কের টাকাও পাচ্ছেন তারা।
আগষ্টের পূর্বে কাউসারের শীততপ নিয়ন্তিত এই বাড়িতেই সংরক্ষণ করা হতো অয়নের অস্ত্র ভাণ্ডার, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমাতে তার বাড়ি থেকেই বের হয় সিংগভাগ অস্ত্র যা দিয়ে এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়া হয় আন্দোলনকারিদের ওপর ।
সেই কাউসারের বয়স খুব বেশি নয়। সর্বোচ্চ ৩২ থেকে ৩৫। কিন্তু এটুকু বয়সে এত প্রভাব, প্রতিপত্তি, কীভাবে এ ভেবে সবার চক্ষুই চড়কগাছ হতে পারে। হওয়াটাই স্বাভাবিক। বলা হচ্ছিল নলূয়াপাড়া এলাকার দুর্ধর্ষ অস্ত্রধারি আহম্মেদ কাউসারের কথা। তিনি গডফাদার শামীম ওসমানপুত্র অয়ন ওসমানের ডান হাত হিসেবে পরিচিত। জেলা ও মহানগর ছাত্রলীগকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন অয়ন ওসমানের হয়ে। তবে কারো কারো কাছে এই আহম্মেদ কায়সার ছিলেন অয়ন ওসমানের ছায়া শরীর।
সূত্র মতে, জীবন জীবিকার টানে চাঁদপুর থেকে নারায়ণগঞ্জে আসেন আহম্মেদ কাউসারের বাবা হারুন। উঠেন নিতাইগঞ্জে। স্ত্রী সন্তানসহ স্বল্পমূল্যে বিভিন্ন বাসায় ভাড়া থাকতেন তিনি। জীবিকা নির্বাহের জন্য বেছে নেন ভ্যান চালনা। নলুয়াপাড়ার জজ মিয়ার গ্যারেজের থেকে ভ্যান ও রিকশা নিয়ে চালাতেন তিনি। গত আট-নয় বছর ধরে হারুন মিয়াকে ভ্যান-রিকশা চালাতে আর দেখা যায়নি। অবশ্য ভ্যান-রিকশা চালানোর প্রয়োজন হয়ে উঠেনি তার। কেননা, ইতোমধ্যেই তার ভবঘুরে, কাটুন টোকাই ছেলেটি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গিয়েছেন। ভাড়া বাড়িতেও কষ্ট করে আর থাকতে হয় না তাকে। ছেলের অবৈধ আয়ে নির্মাণ করা বহুতল বাড়িতেই উঠেন।
জানা গেছে, আহম্মেদ কাউসারের উত্থান খুব বেশি দিনের নয়। স্থানীয়দের মতে, আহম্মেদ কাউসার নামে কেউ একজন আছেন তা নিতাইগঞ্জ এলাকার মানুষ চিনতেনও না। যে কাউসারকে তারা চিনতেন সে ছিল একজন ভ্যানগাড়ি চালকের ছেলে। কাজকর্মহীন বেকার যুবক। মাদকের সঙ্গেও ছিল তার সম্পৃক্ততা। কিন্তু হঠাৎ করেই তার পরিবর্তন, চলনে বলনে বেশ পরিবর্তন দেখা যায়। নিতাইগঞ্জের স্থানীয় বাসিন্দা না হলেও হয়ে উঠেন প্রভাবশালীদেরও প্রভাবশালী একজন। সমীহ করতে শুরু করেন মানুষজন।
সূত্র বলছে, নলূয়াপাড়া ফয়েজউদ্দিন লাভলুর মেয়ের সঙ্গে প্রেম করতেন উঠতি বয়সের তরুণ অয়ন ওসমান। এই প্রেমের সূত্র ধরে ঘনঘন যাতায়াত ছিল তার ওই এলাকাতে। এরমধ্যে লাভলুর ছেলে কিশোর গ্যাং লিডার ভিকির মাধ্যমে কাউসারের সঙ্গে পরিচয় হয় অয়নের। সেখান থেকেই বেয়াদব হিসেবে পরিচিত অয়নকে মাদক সাপ্লাই থেকে শুরু করে প্রেমের ক্ষেত্রে নানাভাবে সহযোগিতা করে বিশ্বস্ত হয়ে উঠেন কাউসার। অয়ন ওসমানের আশেপাশে থাকা অন্যদের থেকেও কাউসার বেশি ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন অয়ন ওসমানের। পরে অয়ন ওসমান বিয়ে করলে কাউসারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নাটকীয়ভাবে আরও বাড়তে থাকে। এই ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে রাতারাতি বদলে যেতে থাকে কাউসারের ভাগ্য। সঙ্গে সঙ্গে কাউসার থেকে হয়ে উঠেন আহেম্মদ কাউসার। তিনি হাঁটলে তার পিছনে হাটেন আরও অনেকে। গলির চায়ের দোকান কিংবা ফুটপাতে খেয়ে না খেয়ে ঘুরে বেড়াতেন যে ছেলেটি সে এখন দলবল নিয়ে চলাফেরা করেন, গাড়ি হাঁকাচ্ছেন। তার গাড়ির পিছনে থাকছে হোন্ডার বহর। কী এমন ওই আরব্য আশ্চর্য্য প্রদীপের জাদুর কাঠির ক্ষমতাবলে রাতারাতি তার এমন পরিবর্তন নাকি তিনি কোনো টাকার গাছের হদিস পেয়েছেন এমন আলোচনা সর্বত্র।
যদিও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, বিনা পুঁজিতে, বিনা ব্যবসায় রাতারাতি অঢেল অর্থবিত্তের মালিক বনেছেন আহম্মেদ কাউসার। যে এলাকাতে ভাড়ায় বসবাস করতেন একসময় সে এলাকাসহ পাশের এলাকাতে নির্মাণ করেছেন বহুতল দুটি বাড়ি। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, নূলায়া পাড়া এলাকার অমল্য মিষ্টান্ন ভান্ডারের পাশে আহম্মেদ কাউসার জমি কিনে নির্মাণ করেছেন বিশাল অট্টালিকা। এই বাড়িটির জন্য জমি ক্রয় ও বাড়ি নির্মাণ বাবদ কম করে হলেও ৬ কোটি টাকা খরচ করেছেন তিনি। বাড়ির ভেতরের ডেকোরেশন করতেও খরচ করেছেন কোটি টাকা। এই বাড়িটিকে সবাই হোয়াইট হাউজ হিসেবে চিনেন।
অন্যদিকে নলূয়া পাড়ার পাশ্ববর্তী বাপ্পী চত্বরেও করেছেন বহুতল আরও একটি বাড়ি নির্মাণ। প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের এই বাড়ি। গাড়ি কিনেছেন অর্ধকোটি টাকার মূল্যে। পরিবারের লোকজনের জন্য রয়েছে একাধিক গাড়ি। নিজ বাহিনীর জন্য কিনেছেন বেশ কয়েকটি মোটর বাইক। এবার প্রশ্ন জাগতেই পারে এতকিছু এত অল্প সময়ে কী করে করলেন আহম্মেদ কাউসার !
চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী, মাদক ব্যবসার, ঝুট সেক্টর, লোড আনলোড, ইন্টারনেট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ থেকে প্রতিমাসেই আহম্মেদ কাউসারের পকেটে। আর এসবই তিনি পেতেন অয়ন ওসমানের আশীর্বাদে। তিনি শহর ও শহরতলীর বিভিন্ন সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করতেন অয়ন ওসমানের পক্ষে। বিভিন্ন সেক্টর থেকে তিনি অয়ন ওসমানের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতেন। সে চাঁদার টাকার বৃহত্তম একটি অংশ অয়ন ওসমানকে পৌঁছে দিতেন এবং অপর একটি অংশ তিনি নিজের জন্য ও বাহিনীর জন্য রাখতেন।
আহম্মেদ কাউসারের বাড়িতে নিরাপদে অস্ত্র সংরক্ষণ করতেন অয়ন ওসমান। কথিত রয়েছে অয়ন ওসমানের অস্ত্রের ভান্ডার ছিল এই আহম্মেদ কাউসারের বাড়িতেই। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যত ধরণের দেশী ও বিদেশী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে তার সিংহভাগই বের হয়েছিল আহম্মেদ কাউসারের বাড়ি থেকে। পাশাপাশি ওই ঘটনায় আরও কিছু অস্ত্র বের হয়েছিল ফয়েজউদ্দিন লাভলুর বাড়ি থেকেও।
এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো জানায়, স্থানীয় কাউন্সিলর কামরুল হাসান মুন্নাকেও তোয়াক্কা করতো না এই কাউসার । এই রিক্সাচলক হারুন পুত্র কাউসারের ভয়ে ওসমান পরিবারের অন্যতম চাটুকার কাউন্সিলর মুন্না সব সময় থাকতো টটস্থ। আর মুন্নার অন্যতম হাতিয়ার মাদক সম্রাট সালাউদ্দিন বিটু এই কাউসারের মাধ্যমে এমপি পুত্র অয়ন ওসমানের কাছে পৌঁছানো হতো মাদকের বিশাল বখড়া । অভিযোগ রয়েছে নগরীর অন্যমত এই মাদক সম্রাট সালাউদ্দিন বিটু এমপি শামীম ওসমানের বিয়াই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী লাভলুর মাধ্যমে প্রতিমাসে নারায়ণগঞ্জ সদর থানার ওসিকে ৫ লাখ টাকা মাসোয়ারা দিয়ে নির্বিঘ্নে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলো।
সবশেষ শনিবার (২৪ আগষ্ট) বিকেলে বিকেলে নলুয়াপাড়া এলাকায় দীর্ঘক্ষণ অনুসন্ধ্যানকাালে প্রতিবেদককে কেউ কোন তথ্য দিয়ে সহায়তা করতেও সাহস করে নাই এই কাউসার ও তার বাহিনীর ভয়ে। তবে অনেক কষ্ট একজন ব্যবসায়ীর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে তার নাম প্রকাশ না হবে না এমন শর্ত দিয়ে বলেন, “কাউসার কে কেউ কিছু বলবে এই সাহস যখন মুন্নাও করতো না তাইলে আর কে তাকে ঠেকাবে। তার বাড়িতে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন আর মাদকের আসর ছিলো নিত্য দিনের বিষয়। গেলো জুলাই মাসে আন্দোলন চলাকালীন সময়ে এই কাউসার তার বাবাকে পিটিয়ে কোমড়ের হাড় ভেঙ্গে দিয়ে চীরতরে পঙ্গু (বিছানায় শুইয়ে) করে দিয়েছে। ৫ আগষ্টের সকালেও এই কাউসারকে দেখা গেছে অস্ত্র প্রদর্শন করতে। বিকেলের পর থেকে আর তাকে দেখা না গেলেও গুরুতর অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে সন্ত্রসী কাউসারের মা অনেকটা ভয়ে আর আতংকে দিনাতিপাত করছে।”









Discussion about this post