নারায়ণগঞ্জ ডিবি পুলিশে পোস্টি পেতে একজন ইন্সপেক্টর বিগত সরকারের শাসনামলে পুলিশের হেড কোয়ার্টার থেকে শুরু করে জেলা পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে প্রায় অর্ধ (পঞ্চাশ লাখ) কোটি টাকা ব্যায় করার ঘটনা ছিলো অসংখ্য।
আর দারোগার পোস্টিং পেতে খরচা হতো নিম্নে ১০ লাখ। কন্সস্টেবল পোস্টিং পেতে ১ লাখ টাকা । এই পোস্টিং রেট (হার) ছিলো সকলের কাছে ওপেন সিক্রেট। আর এতো টাকা খরচা করে পোস্টিং পেয়েই নারায়ণলগঞ্জের সর্বত্র আটক বাণিজ্য চলতো দিনরাত ২৪ ঘন্টা। বিগত সময়ে ডিবি পুলিশকে বলা হতো “আন – ছাড় – খা” !
এমন কোন অপকর্ম নাই যা এই ডিবি পুলিশ করতো না। সেই ডিবি পুলিশের নগ্ন দৌড়াত্ম ৫ আগষ্টের পর থেকে বন্ধ থাকলেও এবার নতুন করে সেই পুরানো কর্মকান্ড নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে নারাযণগঞ্জে । যা নিয়ে তদন্ত চলছে পুলিশের পক্ষ থেকে।
জানা যায়, রূপগঞ্জে ৫২০ বোতল ফেনসিডিল ও ৫০ কেজি গাঁজাসহ আটকের পর কুক্যাত মাদক কারবারী আমির হোসেন নামের একজন নামধারী যুবদল নেতাকে ছেড়ে দিয়েছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
রূপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব মাসুম বিল্লাহ জোড়ারো তদবির ও অনৈতিক লেনদেনের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একইসঙ্গে জব্দকৃত ওই মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেখিয়ে একই এলাকার এক প্রতিবন্ধী যুবককে কারাগারে পাঠিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ।
১৯ মে (সোমবার) রাতে উপজেলার ভুলতা ইউনিয়নের পাড়াগাঁও এলাকা থেকে ফেনসিডিল ও গাঁজাসহ আটকের পর যুবদল নেতাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অভিযুক্ত আমির হোসেন ভুলতা ইউনিয়ন যুবদলের প্রচার সম্পাদক ও ভুলতা ইউনিয়নের পাড়াগাঁও এলাকার নুরু মিয়ার পুত্র। আমির হোসেনের বাড়ি থেকে জব্দকৃত মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেখিয়ে একই এলাকার প্রতিবন্ধী ইউসুফ মিয়া (২৬) কে ওই মাদক মামলা আটক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
রূপগঞ্জ উপজেলার পাড়াগাঁও এলাকার একাধিক ব্যক্তি ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দুইজন এলাকাবাসী জানায়, সোমবার দিবাগত রাত ৩টার (১৯ মে) দিকে যুবদল নেতা আমির হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালায় ডিবি পুলিশ। অভিযানে ৫২০ বোতল ফেনসিডিল ও ৫০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করার পাশাপাশি মাদক কারবারী আমিরকে আটক করে ডিবি পুলিশ।
আটকের পর আমির জানান, উদ্ধার করা মাদকের সঙ্গে প্রতিবেশী প্রতিবন্ধী ইউসুফ মিয়া জড়িত। ওই সময় ইউসুফ মিয়ার বাড়িতে অভিযান চালানোর পর কোন কিছু উদ্ধার না হলেও জিজ্ঞাসাবাদের কথা বলে ইউসুফকে সঙ্গে নিয়ে যায় ডিবি পুলিশ। আর জোড়ালো তদ্বিরের পর ভোররাতে আমিরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মাদকসহ ইউসুফকে গ্রেফতার দেখিয়ে মঙ্গলবার সকালে আদালতে পাঠানো হয়।
পাড়াগাঁও এলাকার একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে জানিয়েছেন, ইউসুফ একজন বাক প্রতিবন্ধী। গরু খামার করেছেন। তার বিরুদ্ধে এলাকায় মাদক সংশ্লিষ্টতার কোনও অভিযোগ ছিলো না কখনো। সিগারেট পর্যন্ত খায় না ইউসুফ। মূলতঃ ছাত্রদল নেতা মাসুম বিল্লাহ নিজেই এলাকায় মাদক ব্যবসা চালাচ্ছেন তারই সহযোগী আমির হোসেনকে দিয়ে। তার বাড়ি থেকে ফেনসিডিল ও গাঁজা উদ্ধারের পর প্রতিবন্ধী ইউসুফকে ফাঁসিয়ে দিয়েছেন দুজনে। ঘটনাটি পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়বে। ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে এ ঘটনায় নিরপরাধ এক ছেলেকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে পুলিশ। এমন কান্ড বিগত দিনেওঅসংখ্যবার হয়েছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ডিবি পুলিশের এক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নিরীহ ছেলেটাকে মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হলো। অথচ মূল অপরাধী আমির হোসেন। উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব মাসুম বিল্লাহর মদতে এলাকায় মাদক ব্যবসা করছেন আমির। তার বাড়ি থেকেই ৫২০ বোতল ফেনসিডিল ও ৫০ কেজি গাঁজা উদ্ধার করেছিল ডিবি। অথচ তাকে ছেড়ে দিলেন ডিবির কর্মকর্তারা।
প্রতিবন্ধী ইউসুফ মিয়ার মা জুলেখা বেগম সাংবাদিকেদের জানান, ‘রাত (সোমবার দিবাগত) ৩টার দিকে আমাদের এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী আমির হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ডিবি পুলিশ আমাগো বাড়ি এস জানতে চায়, ‘ইউসুফ বাসায় আছে কিনা ?‘ আমি ঘরের দরজা খুলে দিলে ডিবি পুলিশ কক্ষে তল্লাশি করলেও কিন্তু কিছুই পায় নাই। এরপর ইউসুফকে বাইরে যেতে বললে আমি কারণ জানতে চাইলে ডিবি পুলিশের একজন জানায়, ‘স্যার কথা বলবেন।’ পরে জানতে পারি আমির হোসেনের বাসা থেকে বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও গাঁজা উদ্ধার করছে পুলিশ। সেগুলোর সঙ্গে আমার প্রতিবন্ধী ছেলেকে সংশ্লিষ্ট দেখিয়ে জেলহাজতে পাঠায়। যার বাসা থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে, সেই আমিরকে ছেড়ে দিয়েছে ডিবি পুলিশ। আমি পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ জানাই, ঘটনাটি যেন সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়। মূলত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হউক। সঠিক তদন্ত কইরা আমার নিরপরাধকে প্রতিবন্ধী ছেলেকে মুক্তি দেওয়া দেয়ার জন্যও অনসুরোধ করতেছি।’
উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্যসচিব মাসুম বিল্লাহ এ বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য একটি চক্র আমার বিরুদ্ধে এসব মিথ্যা তথ্য ছড়াইতেছে।’ অভিযুক্ত ভুলতা ইউনিয়ন যুবদলের প্রচার সম্পাদক আমির হোসেনের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।
রূপগঞ্জ উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল ইসলাম প্রিন্স গণমাধ্যমকে বলেন, ‘এমন কোনও ঘটনা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে যদি প্রমাণ পাওয়া যায় তাইলে সাংগঠনিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
যার বাসা থেকে মাদক উদ্ধার করা হয়েছে তাকে ছেড়ে দিয়ে অন্যজনকে কারাগারে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলার পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার জানান, ‘প্রকৃত অপরাধীকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। মাদকসহ একজনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে বলে শুনেছি। যেহেতু ডিবি পুলিশের বিরুদ্ধে মূল অপরাধীকে ছেড়ে দিয়ে নিরাপরাধ একজনকে ফাঁসানোর অভিযোগ উঠেছে, সেহেতু ঘটনাটি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’









Discussion about this post