নারায়ণগঞ্জের সকল সড়কসহ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে হাইওয়ে পুলিশ, থানা পুলিশ, জেলা পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে অবৈধ যান চলাচলের অভিযোগ উঠেছে।
বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের পূর্বে আওয়ামীলীগের শাসনামলে লাগামছাড়া অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশ. হাইওয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন থানা পুলিশ নানাভাবে মাসোহারার চুক্তি করে বাই সাইকেল আর মটর সাইকেল ছাড়া সকল ধরণের যানবাহন থেকে উৎকোচ আদায়ের মাধ্যমে অবৈধ পন্থায় চলতো পরিবহন। বাস, ট্রাক, মিনি বাস, স্ট্যান্ডের সকল পরিবহন, সিএনজি, অটো রিকশা থেকে নিয়মিত টোকেন দিয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর অসাধু কর্তাদের ম্যানেজ করে চলছিলো বিরামহীনভাবে।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট আওয়ামীলীগের পতনের পর কয়েকমাস নারায়ণগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশ. হাইওয়ে পুলিশ ও বিভিন্ন থানা পুলিশের ক্যাশিয়ার প্রথা চালু থাকলেও কোন যানবাহন থেকে সেই পুরানো মাসোহারা উত্তোলন ছিলো বন্ধ। এমন মাসোহারা বন্ধ থাকার এক পর্যায়ে ফের গত তিন / চার মাস যাবৎ ফের শুরু হয়েছে টোকেন বাণিজ্য।
এমন যানবাহনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সাংকেতিক টোকেন দিয়ে নির্বিঘ্নে এসব যান চলার সুযোগ দিচ্ছে পুলিশেল বিভিন্ন সংস্থা।
যানবাহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, একেবারেই প্রতিটি অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে কাঁচপুর এলাকার হারুন অর রশিদ ও শম্ভুপুরা ইউনিয়নের কাজিরগাঁও গ্রামের ঈসমাইল হোসেনের মাধ্যমে মাসে ১ হাজার ২০০ টাকা আদায় করে কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশ।
মহাসড়কে নির্বিঘ্নে চলাচলের জন্য অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশাকে পুলিশ ‘স্বাধীন বাংলাদেশ’ ও ‘ঈদ মোবারক’ নামে সাংকেতিক টোকেন দিয়ে এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। টোকেন থাকা গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না পুলিশের কোন সংস্থা ।
জানা যায়, কাঁচপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় অবাধে চলছে অবৈধ যান নছিমন, ভটভটি, ব্যাটারিচালিত রিকশা, রিকশা, ভ্যান ও অটোরিকশা। আরে এই অবৈধ পরিবহনগুলো কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপরদিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাঁচপুর থেকে যাত্রামূড়া পর্যন্ত অবৈধ যান চলাচল করে একই পন্থায়। আর এতেই বাড়ছে দুর্ঘটনা। কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত সাতটি স্থানে মহাসড়কের উপর গড়ে তোলা হয়েছে অবৈধ স্ট্যান্ড। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। এই অবৈধ স্ট্যান্ড থেকেও মাসোহারা আদায়ে করছে হাইওয়ে পুলিশ।
মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশা, অটোরিকশা, নছিমন-করিমন-ভটভটিসহ অসংখ্য অবৈধ যানবাহন চলছে বিনা বাধায় বিরামহীনভাবেই। মহাসড়কে হাইওয়ে ও থানা-পুলিশের একাধিক গাড়ি চললেও অবৈধ যান চলাচলে বাধা দিতে দেখা যায় নাই কোথাও। টোকেন দিয়ে চলাচালরত এই যানবাহন উল্টো পথ ব্যবহার করছে সবচেয়ে বেশি। চালকদের নেই লাইসেন্স-প্রশিক্ষণ, নেই গাড়ির ফিটনেস।
এমন ঘটনায় অটোরিকশা চালকদের দাবি, গত ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর থেকে হাইওয়ে পুলিশ মাসিক ভিত্তিতে নির্দিষ্ট টোকেন দিয়ে মহাসড়কে অবৈধ যান চলাচলের সুযোগ দিয়েছে।
জানা যায়, কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত অবৈধ যানবাহন চলাচল করায় কয়েক দিন পরপরই দুর্ঘটনা ঘটছেই। বিগত ১৬ মাসে এ মহাসড়কে ছোট-বড় ৯৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। আর এতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮৩ জন। আহত হয়েছেন অসংখ্য।
টেকেনের বিষয়ে অটোরিকশা চালক আমজাদ আলী জানায়, আরে ভাই কয়লা ধুইলে কি ময়লা যায় ? আমার মালিকের ১০টি অটোরিকশার মধ্যে একটা রিকশা আমি আমাজাদ চালাই। আর এই ১০টা অটো রিকশার জন্য তিনি কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশকে হারুনের মাধ্যমে মাসে ১০ হাজার টাকা দেয় মহাজন। হাইওয়ের ওসি নাকি মোর্শেদ আছে, তিনিই এই অটো ছাড়াও রাস্তার পাশের টং দোকান থেইক্কাও চান্দা নেয়। দেখেন তো তিন চার নাস পর পর উচ্ছেদ নাটক করে ঘুষের রেট বাড়ায় এই মোর্শেদ। তার ৮/১০ জন চান্দা উঠানোর লোক আছে। তাদের দিয়েই চান্দা তুলে। আর কেউ জিগাইলে এই মোর্শেদ নিজেরে ইমামসাব দাবী করে। তারে জিগাইয়া দেখেন তিনি কি কয় !’
এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে আমজাদ আলী আরো অনেক মন্তব্য করেছেন।
হাইওয়ে পুলিশকে মাসিক ভিত্তিতে প্রতি রিকশার জন্য ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দিতে হয়। এ টাকা সংগ্রহ করেন ঈসমাইল। তাদের এলাকার ২৭ জন রিকশাচালক এ টাকা দেন। এমনটা জানান ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক জাহাঙ্গীর মোল্লা।
এমন অভিযোগে চাঁদা আদায়কারী ঈসমাইল হোসেন বলেন, “হাইওয়ে পুলিশ যে গাড়ি আটক করে গাড়িগুলো তিনি পাহারা দিয়ে রাখেন। তবে টোকেন দিয়ে চালকদের কাছ থেকে তিনি টাকা নেন না। এর প্রমাণ নাই করো কাছে ।“
অপর চাঁদাবাজ হারুন অর রশিদ বলেন, ‘টোকেনগুলো গত বছরের ৫ আগস্টের আগের। এখন আর টোকেন দেওয়া হয় না।’
এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে স্বপক্ষে কাঁচপুর হাইওয়ে থানার ওসি কাজী ওয়াহিদ মোর্শেদ বলেন, অবৈধ যানের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। আর এসব যানবাহন চলাচলে হাইওয়ে পুলিশ বাধা দিয়ে আসছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছু অটোরিকশা মহাসড়ক দিয়ে চলছেই। তবে টাকার বিনিময়ে অবৈধ যান চলাচলের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি সত্য নয় বলে দাবি করেন ওয়াহিদ মোর্শেদ ।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে মহাসড়কে অটোরিকশা, টেম্পোসহ সব ধরনের ধীরগতির যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করে সড়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এসব যানবাহনকে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী করে উচ্চ আদালতও চলাচল বন্ধে প্রশাসনকে নির্দেশ দেন। নির্দেশনার পর পুলিশ প্রশাসন কিছুদিন এসব যানবাহন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিলেও এখন নিয়ন্ত্রণে তেমন উদ্যোগ নেই। চলছে মাসোহারার রাম রাজত্ব।









Discussion about this post