নারায়ণগঞ্জ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিভিন্ন সেক্টরে নিয়মিত মাসোয়ারা দিয়ে চলছে তিতাস গ্যাস চুরির মহোৎসব । এমন চুরি বিষয়ে অসংখ্য প্রতিবেদন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলেও দূর্ণীতি আর অপরাধকে প্রাধান্য দিয়ে ঘুষ বাাণিজ্য অব্যাহত রেখেছে অসাধু চক্র। একদিকে তিতাস মোটা অংকের টাকায় মৌখিকভাবে অবৈধ সংযোগের অনুমতি দিলেও ধরা পরলে পরবর্তীতে তারা কিছুই জানেন না বলে ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করে এমন লুটপাট দূর্ণীতি।
অপরদিকে জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর তো দূর্ণীতির আখড়া । টাকার জন্য এই সংস্থার পিয়ন থেকে কর্তা সকলেই যেন ‘হা’ করে থাকেন।
আর এ সকল অপরাধ দেখতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থাকলেও তাদের ক্যাশিয়ারখ্যাত অপরাধীরা যেন একে অপরের পরিপূরক, এ ক্ষেত্রে বিশেষ পেশার কয়েকজন রয়েছে এই গ্যাস চোর চক্রের তালিকায়
সোনারগাঁয়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কোটি টাকার গ্যাস চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে অবৈধভাবে গড়ে তুলা ২৩টি চুনা ও ঢালাই কারখানা থেকে।
ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে তুলছে অবৈধ চুনা ও ঢালাই কারখানা।
তিতাস গ্যাসের অসাধু কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে এসব করাখানা গড়ে তুলেছে।
ফলে সরকারের রাজস্ব চুরির পাশাপাশি পরিবেশের মারাক্তকভাবে ক্ষতি হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন যেন দেখেও না দেখার অভিনয় করেই যাচ্ছে অনবরতঃ।
স্থানীয়দের দাবি, পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেতে এসব চুনা ও ঢালাই কারখানা বন্ধের জন্য। তবে এসব অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের ক্ষেত্রতে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ অভিযান চালানোর ঘোষনা দিলেও তা বাস্তবায়নে ঘড়িমসি করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ শিমরাইল এলাকায় গ্যাসের মাধ্যমে পাথর গলিয়ে চুনা তৈরি করা হতো। স্থানীয় প্রশাসন পরিবেশ বিপর্যয়ের কারনের সেখানকার চুনা কারখানা গুলো উচ্ছেদ করলে সোনারগাঁয়ে এসে সেই অসাধু চক্র চারটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় অবৈধ গ্যাস চুরির মহোৎসব চালিয়ে ফের চুনা কার্যখানা গড়ে তোলে।
সোনারগাঁও উপজেলার পিরোজপুর, মোগরাপাড়া, কাঁচপুর, সাদিপুর ইউনিয়ন ও সোনারগাঁ পৌরসভায় এসব অবৈধ কারখানা ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে। চালাচ্ছে তিতাস গ্যাস চুরির রাম রাজত্ব।
আর বর্তমানে তিতাস গ্যাস চুরির এই মহোৎসবে সব কারখানায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তাদের দাবি বিগত ১৭ বছর শেখ হাসিনার শাসন আমলে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা এই গ্যাস চুরি করে এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে তিতাস কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ করে এসব কারখানা গড়ে তুলছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা ।
অভিযোগের সূত্র থেকে আরো সূত্র জানায়, পিরোজপুর ইউনিয়নের আষাঢ়িয়ারচর এলাকায় সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ ও তার ভাই পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল জলিল অবৈধভাবে একাধিক চোরাই সংযোগ দিয়ে গ্যাস চুরি করে চুনা কারখানা গড়ে তুলেছেন। সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক আশরাফ প্রধানের নেতৃত্বে গঙ্গানগর এলাকায় তার ভাগিনা মো. মামুন মিয়া এম এম গার্মেন্টের পরিত্যক্ত ফ্যাক্টরীতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চোরাই গ্যাস সংযোগ দিয়ে চুনা কারখানা গড়েছেন, অনুরূপ চোরাই সংযোগ দিয়ে পিয়ারনগর গ্রামে দুটি ঢালাই কারখানা গড়ে তোলা হয়েছে। ইসলামপুর এলাকায় আরো একটি কারখানা গড়ে তোলার সময় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা হামলা করে চুনের ভাট্টি ভেঙ্গে দেয়।
এছাড়াও প্রতাপের চর এলাকায় নামবিহীন আরো একটি চুনা কারখানা চালু রয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্রের শেল্টারে। একই ইউনিয়নের পিরোজপুর গ্রামে মোজাফফর আলী ফাউন্ডেশনের পাশে ডালিম ও ইউনিয়ন পরিষদের বিপরিত দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের এক বিএনপি নেতা মুনসুর হোসেনের দুটি চুনা কারখানা চালু রয়েছে একই পন্থায় গ্যাসের মাধ্যমে।
পিরোজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি শফিউল আলম বাচ্চু ও তার ভাই নেয়ামতউল্লাহ নেমা তাদের বাড়ির পাশে দুটি ঢালাই কারখানা গড়ে তুলেছেন ওই চোরাই গ্যাস সংযোগ দিয়ে। রতনপুর এলাকায় নুরে আলমের দুটি ঢালাই কারখানা, সোনারগাঁ পৌরসভার পৌর ভবনাথপুর গ্রামে রফিকুল ইসলামের পরিত্যাক্ত বাড়িতে অবৈধ গ্যাসে ঢালাই কারখানা, দুলালপুর এলাকায় সুরুজ মেম্বারের বাড়ির পাশে গড়ে উঠেছে চুনা কারখানা, কাঁচপুর ইউনিয়নের চেঙ্গাইন এলাকায় ৭টি ঢালাই কারখানা চালু রয়েছে গ্যাস চুরির সংযোগের মাধ্যমে।
সাদিপুর ইউনিয়নের দুটি কারখানা, জামপুর ইউনিয়নের মিরেরটেক বাজার এলাকায় ঢালাই কারখানা, মোগরাপাড়া ইউনিয়নে দুটি কারখানা চলছে কোন ধরেনের বাধা বিপত্তি ছাড়াই। প্রতিটি কারখানায় চোরাই গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে ২৪ ঘন্টা।
এতো এতো অবৈধ কারখানায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের ফলে প্রতি মাসে এসব কারখানায় নিম্নে প্রায় ১০ (দশ) কোটি টাকার গ্যাস চুরি করছেন শুধু সোনারগাঁওয়ে এই জানা চক্রের হিসেবমতে। অজানা রয়েছে আরো অসংখ্য গ্যাস চুরির খবর।
খোদ তিতাসের একাধিক কর্মকতা কর্মচারীর সাথে আলোচনা করলে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধে ভিন্ন ভিন্নভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করে অনেকে বলেন, ‘আমি সরকারী বেতন ভাতা পাওয়ার পরও এই চোরাই টাকার ভাগ গ্রহণ করতে হয় বাধ্য হয়ে। নইলে গ্যাস চোর চক্র আর আমাদের তিতাসের কর্তাদের রোষানলে পরে চাকরী ও জীবন হারানোর শংকা রয়েছে। চাকরী বা জীবন হারালে আমার পরিবাবের কি অবস্থা হবে ? এই চিন্তা করে ”কার বা গোয়াল কে বা দেয় ধোয়া” এই নীতিতে তালমিলিয়ে চুরির টাকার ভাগ গ্রহণ করি।’
এমন অসংখ্য চোরাইভাবে চুনা ও ঢালাই কারখানাগুলোতে গ্যাস ব্যবহারের কারনে বৈধ আবাসিক গ্রাহকরা পর্যাপ্ত গ্যাস পায় না। ফলে রান্নাবান্নায় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিনিয়তঃ। চুনা কারখানায় পাথর গলানোর কারনে পরিবেশ দুষণ হচ্ছে মারাত্মকভাবে। ফলে আশপাশের ফসল ও ফল উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে।
এমন ঘটনায় চোরাই সংযোগটি ধরা পরার পর নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চুনা কারখানার মালিক জানিয়েছেন, তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে তারা এসব কারখানা গড়ে তোলেছেন। এই চোরাই লাইন সংযোগের আগেই মোটা অংকেট ঘুষের বিনিময়ে অবৈধ সংযোগের অনুমতি নিতে হয়। এরপর প্রতি মাসে তাদের নির্ধারিত অংকের মাসোহারা দিতে হবেই। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করার আগে তাদের জানিয়ে দেয়, “ম্যাজিস্টেট আসতেছে, কারখানা বন্ধ করে পালিয়ে যান। গুরুত্বপূর্ন সরঞ্জাম তারা সরিয়ে নেন।” এরপর অভিযানে ভেঙ্গে দেওয়ার দু’ তিনদিন পর পুনরায় সেই ভাট্টি ফের গড়ে তোলা হয়।
রতনপুর এলাকার আলাউদ্দিন জানান, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় জনস্বাস্থ্যর ক্ষতিকর চুনাভাট্টির মালিকরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করে। তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না স্থানীয় প্রশাসন। প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করার পরও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। ফলে নানা সমস্যায় এলাকাবাসী আছে মহাকষ্টে ।
পিরোজপুর এলাকার অনেকেই জানান, জেলা পরিবেশ অধিদপ্তর, পুলিশ সুপার কার্যালয়, স্থানীয় থানা ছাড়াও প্রভাবশালীদের ম্যানেজ করে সকল চুনা ও ঢালাই কারখানা চলছে অবিরাম পন্থায়। বর্তমান সরকার এই সকল অবৈধ চোরাই সংযোগধারী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহন না করায় আমরা হতাশ হয়ে পড়েছি।
এ বিষয়ে সোনারগাঁ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আব্দুর রউফ অবৈধ চুনা কারখানা গড়ে তোলেননি বলে দাবি করেন।
এমন ঘটনায় সোনারগাঁ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক আশরাফ প্রধান গণমাধ্যমকে চুনা কারখানার গড়ে সঙ্গে জড়িত নই বলে দাবি করে বলেন এলাকার কিছু দলীয় কর্মী অবৈধ গ্যাস ব্যবহার করে চুনা কারখানা গড়েছেন ।
অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারী অভিযুক্ত মামুন মিয়ার দাবি, বিগত ১৭ বছর শেখ হাসিনার শাসন আমলে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার করে এসব কারখানা গড়ে তুলেছেন। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর বর্তমানে তারা এসব কারখানা গড়ে তুলছেন।
আর এমন গ্যাস চুরির মহোৎসবের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন এন্ড ডিস্ট্রিউিশন কোম্পানির উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী রাজীব কুমার সাহা বলেন, চুনা ও ঢালাই কারখানায় অবৈধ গ্যাস ব্যবহারের বিষয়টি মন্ত্রনালয়ের বিভিন্ন সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো ভেঙে দেওয়ার পরও গড়ে তোলা হয়েছে।
তিতাসের কর্মকর্তা কর্মচারীদের জড়িত থাকার প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন রাজীব কুমার সাহা।
অথচ এই রাজিব কুমার সাহার বিরুদ্ধেও রয়েছে লোমহর্ষক গ্যাস চুরির অভিযোগ।









Discussion about this post