সিদ্ধিরগঞ্জে চোরাই গ্যাসের বিস্ফোরণে আরও এক জনের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার (২৯ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আসমা বেগম (৩৫)। আর এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের সাতজনের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে। এমন সাত জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পরও নাারয়ণগঞ্জের আইনশৃংখলা বাহিনীর কোন সংস্থার মাঝে টনক নড়ে নাই।
বৃহস্পতিবার মারা যান আসমার মেয়ে কলেজছাত্রী তানজিলা আক্তার তিশা (১৭) এর আগে আসমার বোন সালমা বেগম (৩০), ভায়রা হাসান গাজী (৪০), তার চার বছরের মেয়ে জান্নাত, এক মাস বয়সী শিশু ইমাম উদ্দিন এবং নানি তাহেরা আক্তার (৫৫) এর মৃত্যু ঘটে।
বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সটিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. সুলতান মাহমুদ শিকদার তাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বিস্ফোরণে দগ্ধ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশু আরাফাত হোসেনের বাবা তানজিল হোসেন তাঞ্জু কান্না জড়িত অবস্থায় বলেন, ‘তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে হওয়া বিস্ফোরণে আমার স্ত্রী আসমা বেগম আর আমার মেধাবী কলেজ পড়ুয়া মেয়ের জীবন কেড়ে নিলো। একই সাথে শ্যালিকা, ভায়রা, তাদের সন্তানরা, এমনকি স্ত্রী ও শালিকার মাকেও কেড়ে নিলো। পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল এই বিস্ফোরণে। এমন ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই আমি।’
তানজিল হোসেন আরও জানান, স্ত্রীর আসমা আক্তারের মরদেহ নিয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চকবদন গ্রামে রওনা হয়েছি, কলেজছাত্রী মেয়ের কবরের পাশে তাকেই দাফন করা হবে।
মেধাবী ছাত্রী তানজিলা আক্তার তিশার অকাল মৃত্যু নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের সহপাঠীদের কাছে ছিলেন অত্যান্ত শোকের। মেধাবী তানজিলা আক্তার তিশা অকাল মৃত্যুতে সহপাঠী ও স্থানীয়দের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
এখনো মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে ২ শিশু
চিকিৎসাধীন রয়েছে দুই শিশু, আসমার ছেলে আরাফাত হোসেন (১৫) ও হাসানের মেয়ে মুনতাহা (১১)। মুনতাহা হারিয়েছে বাবা, মা, ভাই-বোনসহ চারজনকে। অন্যদিকে আরাফাত হারিয়েছে মা ও বড় বোনকে। তাদের অবস্থাও সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
২২ আগস্ট শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল আবাসিক এলাকার জাকির খন্দকারের টিনশেড বাড়িতে এই বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়লে দুটি কক্ষে ঘুমিয়ে থাকা নয়জন নারী ও শিশু দগ্ধ হন। পরে তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও জাতীয় বার্ন ইন্সটিটিউটে ভর্তি করা হলে একে একে পরপারে পাড়ি জমান সাত জন। আরো দুই জন রইলো বাকী।
বিস্ফোরণের কারণ নিয়ে বিতর্ক / আইনশৃংখলা বাহিনীর চতুরতা – গাফিলতি
নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের অনুমান নির্ভর প্রাথমিক ধারণা থেকে জানায়, বিদ্যুতের শর্ট সার্কিট থেকে ফ্রিজের কম্প্রেসার বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে তাার শুনেছেন এবং ঘরের বাইরে থেকে দেখতে পেয়েছেন একটি ফ্রিজের সাথে বৈদ্যুতিন সংযোগ দেয়া আছে। এমন ধারনা থেকেই ফায়ার সার্ভিসের অনুমান নির্ভর প্রাথমিক ধারণা তেকে ফ্রিজের বিস্ফোরণের কথা বলা হয়েছে।
এমন বিস্ফোরণে স্থানীয়দের দাবি, বাড়ির নিচ দিয়ে যাওয়া তিতাস গ্যাসের মোটা পাইপলাইনে দীর্ঘদিন ধরে লিকেজ রয়েছে। আর পাইপ লাইন থেকে মুড়ি কারখানা ও চুনা কারখানায় অবৈধ তিতাস গ্যাসের সংযোগ দেয়া আছে। ওই পাইপ থেকে গ্যাসের তীব্র গন্ধ পাওয়া যেত এবং অতীতে ছোটখাটো আগুনও লেগেছিলো। এলাকাবাসীর অভিযোগ, গ্যাস কোম্পানির অসাধু চক্র প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা মাসোয়ারা নেন এই অবেধ কারখানার থেকে । আর এই কারণেই অবহেলাই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার মূল কারণ।
এমন অভিযোগ অস্বীকার করে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ বলেন, ‘বাড়িটির গ্যাস লাইন বৈধ। পরিদর্শনে কোনো লিকেজ পাওয়া যায়নি।’
আদমজী ফায়ার স্টেশনের কর্মকর্তা মীরন মিয়াও জানান, ‘প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাস লিকেজের প্রমাণ মেলেনি। তবে বিস্তারিত তদন্তে একটি কমিটি গঠন হতে পারে।’
এমন বিস্ফোরণের ঘটনা ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে তাৎক্ষণিকভাবে চুনা ভাট্টি ও মুড়ি কারখানার লোকজন চোরাই গ্যাস বিস্ফোরণের পরিবর্তে ফ্রিজের বিস্ফোরণ বলে প্রচার চালায়। এমন ঘটনা কোন তদন্ত না করেই ফ্রিজের বিস্ফোরণ বলে মন্তব্য করে ফায়ার সার্ভিস ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। একই সাথে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ চোরাই গ্যাসের সংযোগের বিষয়টি অত্যান্ত চতুরতার সাথে এড়িয়ে যাচ্ছে এখনো পর্যন্ত।









Discussion about this post