নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় অবস্থিত যমুনা অয়েল ডিপু থেকে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল চুরির ঘটনাকে ঘিরে চলছে তীব্র আলোচনার ঝড়। এ ঘটনায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও স্থানীয়ভাবে অভিযোগ উঠেছে, এই তদন্ত কার্যক্রম আসলে “ধামাচাপা দেওয়ার নাটক” ছাড়া কিছু নয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার পর বিপিসির কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অত্যন্ত গোপনে কালো গ্লাসযুক্ত একটি গাড়িতে করে ফতুল্লার যমুনা ডিপুতে যান। তারা সেখানে অবস্থান করেন অল্প সময়ের জন্য এবং কারও সঙ্গে সরাসরি কথা না বলেই চলে যান। ডিপুর অনেক কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানিয়েছেন, পরিদর্শনে আসা কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছিলেন ডিপুর ‘গডফাদার’ খ্যাত টুটুল, যিনি দীর্ঘদিন ধরে এখানকার তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবসায় আধিপত্য বজায় রেখেছেন।
একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এই ডিপু থেকে নিয়মিতভাবেই তেল চুরি হয়। এবার পরিমাণটা অনেক বেশি হওয়ায় বিষয়টা প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু যাদের ছত্রছায়ায় এ সব হয়, তারা এতটাই প্রভাবশালী যে তদন্তে সত্য প্রকাশ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।”
তারা আরও বলেন, “যারা তদন্ত করছে তারাও সব জানে। টুটুল ও তার প্রভাবশালী মহলের দিকেই আঙুল উঠছে। কিন্তু কেউ মুখ খুলছে না। তদন্ত নামের নাটক মঞ্চায়ন করেই বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, বিপুল পরিমাণ তেল চুরি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি এবং জ্বালানি খাতে ভয়াবহ দুর্নীতির উদাহরণ। তারা স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যাতে প্রকৃত অপরাধীরা শনাক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়।
যমুনা ডিপুর এই তেল চুরির ঘটনায় এখন নজর দেশজুড়ে। কিন্তু তদন্তের নামে যদি আবারও গোপন স্বার্থ রক্ষা হয়, তাহলে জ্বালানি খাতের প্রতি জনগণের আস্থা আরও এক ধাপ নিচে নামবে — এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্য সূত্রে আরো জানা যায়, রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি যমুনা অয়েলের ফতুল্লা ডিপো থেকে তেল চুরির ঘটনা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। এর পূবেই ‘সরকারি ডিপো থেকে পৌনে ৪ লাখ লিটার ডিজেল গায়েব’ শিরোনামে ১ অক্টোবর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল সংবাদ মাধ্যমে।
এমন ঘটনায় অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রস্তাবিত কমিটি করে সোমবার (৬ অক্টোবর) অফিস আদেশ জারি করেছে জ্বালানি বিভাগ। আর এই আদেশের আগামী তিন কার্য দিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার প্রধানকে একজন উপযুক্ত প্রতিনিধি মনোনয়নের জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ওই আদেশে বলা হয়, ফতুল্লার যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ডিপো থেকে তেল চুরির এমন সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কমিটির কার্য পরিধিতে আগামী ১৫ কার্য দিবসের মধ্যে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে দায় নির্ধারণ করার কথা বলা হয়েছে। ওই আদেশে আরও বলা হয়, ভবিষ্যতে এই ধরনের অপরাধ রোধকল্পে সুপারিশ প্রদান করবে তদন্ত কমিটি। এতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), যমুনা অয়েল কোম্পানি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে একজন করে প্রতিনিধিও রাখার কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি জ্বালানি তেল চুরি ও অপচয় রোধে ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইন নির্মাণ করেছে সরকার। এই পাইপলাইনে তেল সরবরাহ চালু হয়েছে গত জুন মাস থেকে। চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় জ্বালানীর মূল টার্মিনাল থেকে সরাসরি তেল আসছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় পঞ্চবটিস্থ ডিপোতে। আর এই যমুনা অয়েল কোম্পানির ফতুল্লা ডিপো থেকে দুই দফায় গায়েব হয়ে গেছে ৩ লাখ ৭৫ হাজার লিটার ডিজেল।
জ্বালানী তেল গায়েবের বিষয়টি ইতিমধ্যে আমলে নিয়ে ফতুল্লা ডিপোর ২২ ও ২৩ নম্বর ট্যাংকের সক্ষমতা পুনরায় যাচাই করতে নির্দেশনা দিয়েছে যমুনা অয়েল কোম্পানি। একই সঙ্গে এমন বিষয়টি তদন্ত করতে একটি কমিটি করা হয়েছে।
২৫ সেপ্টেম্বর (বৃহস্পতিবার) যমুনার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে পাঠানো অপারেশন বিভাগের এক চিঠি বলছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম পাইপলাইনের মাধ্যমে ২৪ জুন তেল থেকে সরবরাহ শুরু হয়। ফতুল্লা ডিপোতে তেল গ্রহণ ও সমাপ্ত হয় ৪ জুলাই। ২ লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার তেলের ক্ষতি হয়েছে। আর দ্বিতীয় ধাপে ১৪ সেপ্টেম্বর তেল আসা শুরু হয়, যা শেষ হয় ২২ সেপ্টেম্বর। তখন ক্ষতি হয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৬১৪ লিটার।
এমন ঘটনায় ২৮ সেপ্টেম্বর আরেকটি চিঠিতে ৬ (ছয়) সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এতে পাইপলাইন কোম্পানির একজনকেও রাখা হয়েছে এই কমিটিতে। কমিটি ইতিমধ্যে ফতুল্লা পরিদর্শন করেছে। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে দেখছে তদন্ত কমিটির কর্তারা। আর এই সপ্তাহের মধ্যে তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
এমন গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে ৭ অক্টোবর (মঙ্গলবার) বিপিসির চেয়ারম্যান আমিন উল আহসান গণমাধ্যমকে জানান, জ্বালানি তেল চুরি বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্ত মোটামুটি শেষের দিকে। এ নিয়ে বিস্তারিত জানা যাবে সিগগিরিই।
তথ্য সূত্রে আরো জানা যায়, ফতুল্লার তেলচুরির ঘটনায় তোলপাড়ের সৃস্টি হয়েছে। প্রায় চার লাখ লিটার জ্বালানী তেল চুরির ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়। ঘটনা ধামাচাপ দিতেি ইতিমধ্যেই জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের সচিব থেকে শুরু করে তেলচুরির গডফাদার বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনে হত্যা মামলার পলাতক আসামী সেই জয়নাল আবেদীন টুটুল ওরফে ব্রাজিল বাড়ির টুটুল। প্রকাশ্যে অজ্ঞাত ক্ষমতাবলে ফতুল্লা যমুনা তেলের ডিপোতে পুলিশের নাকের ঢগায় দিয়ে নিজের ইচ্ছে মাফিক এসে হুংকার দিয়ে আবার চলেও যান।
এতো ঘটনার পর ১ অক্টোবর বুধবার (পুজার এই ছুটিতে) বৈষম্য বিরোধী একাধিক মামলার আসামী হয়েও যমুনা ডিপো বন্ধ থাকাবস্থায় কালোগ্লাস যুক্ত গাড়িতে প্রবেশ করেন তেলচুরির গডফাদার টুটুল। সকলকে হুমকি দিয়ে জানান দেন, “এর আগে (আওয়ামীলীগের সময়) আজমেরী ওসমান আমাদের শেল্টার দিতো, এখন জাকির খান শেল্টার দেন। জাকির খানকে ৮০ লাখ টাকায় গাড়ি উপহার দিয়ে তার সাথে কথা ফাইনাল করা হয়েছে। উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সকলেই ম্যানেজ করা আছে । আর প্রেসক্লাবের নেতারা তো আছেন ই তাদের কে প্রতি মাসেই টাকা দিতে হয়। কোন নিউজও হবে না। অতএব কোন অবস্থাতেই যেন মুখ কেউ না খোলে, কেউ যদি মুখ খোলে তাইলে সে যেন তার জীবনটা হাতে নিয়ে মুখ খোলে। তদন্ত কমিটি গঠন হইছে, সাবধান ! কেউ যেন কোন কথা না বলেন।”
ডিপোর গ্রেজার (তেল মাপার অপারেটর) সেকশনের সামান্য কর্মচারী হলেও পুরো ডিপোর গডফাদার এই টুটুল। বিগত সময়ে শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের নাম ব্যবহার করে শত কোটি টাকা তেল চুরি করে গ্রামের বাড়িতে বিশাল মসজিদ নির্মান করতে গিয়ে এবার এলাকাবাসীর রোষোনলে পরেন টুটুল। সম্প্রতি টুটুলের গাড়ি বহর নিয়ে গ্রামের বাড়িতে মসজিদ নির্মাণের সময় চুরির টাকায় মসজিদ নির্মানের কাজে বাধা দিয়ে বিক্ষুদ্ধরা তেলচোর টুটুলের গাড়ি ভাঙচুর করে। এরপর রাজধানীর গুলশানে বসবাস করে চালিয়ে যাচ্ছে ফতুল্লার তেলচুরির মহোৎসব।
নির্ভরযোগ্য সূত্র আরো জানায়, টুটুল এবার পৌনে ৪ লাখ লিটার জ্বালানী তেল গায়েবের ঘটনা ধামাচাপা দিতে যেমন এখন দৌড়ঝাপ চালাচ্ছেন তেমন ই গ্রামের বাড়ি বেগমগঞ্জের আবদুল্লাহপুর এলাকার নিজ পৈতিক বাড়ির পাশে হাজার বিঘা জমি ক্রয় করে সেখানে ৪ হাজার স্কয়ায় ফুটের একটি মসজিদ নির্মানে শুরু করেছেন ৭ কোটি টাকা ব্যায় করে।









Discussion about this post