নগর প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় যিনি ছিলেন ওসমান পরিবারের নেপথ্যের কুশীলব, যিনি নীরবে নানা সমঝোতা ও সমীকরণে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা—সেই মোহাম্মদ আলী এখন আলোচনায় নতুন পরিচয়ে।
সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামানের পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নেমে ফের আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন এই “নয় লাইখ্যা” খ্যাত রাজনীতিক।
ওসমান পরিবারের উত্থানে নেপথ্যের কারিগর
২০১৪ সালের ৩০ এপ্রিল জাতীয় পার্টির এমপি নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হন ছোট ভাই সেলিম ওসমান। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সাবেক এমপি এস এম আকরাম। বিএনপি-সমর্থিত এই প্রার্থীকে মোকাবিলায় তখন সেলিম ওসমানের জয় নিশ্চিত করতে নেপথ্যে কাজ করেন মোহাম্মদ আলী।
রাজনৈতিক কৌশল আর ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে বিএনপির স্থানীয় অনেক নেতাকর্মীকে তিনি সেলিম ওসমানের পক্ষে নিয়ে আসেন। ফলাফল—২৬ জুনের উপনির্বাচনে সেলিম ওসমানের নিরঙ্কুশ জয়। সেই জয়ের পর ফের রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসার চেষ্টা করেন মোহাম্মদ আলী, যিনি পরবর্তীতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পান।
ওসমানদের ঘনিষ্ঠ থেকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার
সেলিম ওসমান ও মোহাম্মদ আলীর যুগল সমন্বয়ে শুরু হয় নতুন অধ্যায়। “জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু” স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে নয় লাইখ্যা মোহাম্মদ আলীর ওসমানপন্থী রাজনীতি।
২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নির্বাচনে তিনি ফের আলোচনায় আসেন বিতর্কিত ব্যাংক ডাকাতির হোতা মোহাম্মদ আলী।
সেলিম ওসমান, শামীম ওসমানের পর এবার শামীম ওসমানের শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুর পক্ষে ক্লাব নির্বাচনে প্রকাশ্যে মাঠে নামেন মোহাম্মদ আলী। ওই নির্বাচনে টিটুর বিজয়ে নেপথ্যে বড় ভূমিকা ছিল তার, এমনটাই জানায় বিভিন্ন সূত্র।
একইভাবে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের পক্ষে নীরবে সক্রিয় ছিলেন মোহাম্মদ আলী। রাজনৈতিক মাঠে ওসমান পরিবারের “বিশ্বাসযোগ্য কৌশলবিদ” হিসেবেই পরিচিতি পান তিনি।
মোহাম্মদ আলীর নতুন মিত্রতা : মাসুদুজ্জামানের পক্ষে অবস্থান
তবে এবার চিত্রটা সম্পূর্ণ উল্টো। ১৩ অক্টোবর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদ্য বিএনপিতে যোগ দেওয়া মাসুদুজ্জামান—যিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং সিটিজেন ব্যাংকের মালিক বনে যান।
সেই সভায় মোহাম্মদ আলী প্রকাশ্যে স্লোগান ধরেন মাসুদের পক্ষে।
মোহাম্মদ আলী তার বক্তৃতায় বলেন, “আগামীতে মাসুদুজ্জামানকে এমপি হিসেবে দেখতে চাই।”
ওসমান পরিবারের পক্ষে থেকে বহু বছর কাজ করা এই মুক্তিযোদ্ধার এমন অবস্থান এখন রাজনৈতিক মহলে নানা জল্পনা-কল্পনার জন্ম দিয়েছে।
আইভী-ওসমান বিরোধে “সমঝোতাকারী” মোহাম্মদ আলী
ব্যাংক ডাকাতিসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ছাড়াও রাজনীতিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রেখেছেন মোহাম্মদ আলী। একসময় মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও ওসমান পরিবারের দ্বন্দ্ব প্রশমনে তিনি ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর অনেকেই তাঁকে “অভিভাবকসুলভ সমঝোতাকারী” হিসেবে বর্ণনা করেন অনেকেই।
নাসিকের বাজেট সভা ও দায়িত্ব গ্রহণ অনুষ্ঠানে আইভী প্রকাশ্যে বলেন— “মোহাম্মদ আলী ভাই বিগত দিনে আড়ালে অনেক কাজ করেছেন। তিনি সাহস যুগিয়েছেন, আমার বাবার সঙ্গে ছিল তাঁর ভালো সম্পর্ক।”
রাজনীতিতে স্থায়ী প্রভাব ও বিতর্ক
১৯৯৬ সালের বিতর্কিত নির্বাচনে এমপি ছিলেন মোহাম্মদ আলী। পরবর্তী সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনের মাত্র ১৭ দিন আগে গিয়াসউদ্দিনকে বিএনপিতে যোগদান করিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করে আলোচনায় আসেন।
তার রাজনৈতিক জীবনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ও অত্যন্ত গোপনে জামায়াত নেতাদের সাথে গভীর সখ্যতার কারণে ত্রিমুখী ধারার সঙ্গেই ছিল নিবিড় সম্পর্ক। সাম্প্রতিক ও বিগত সময়ে একাধিক শিল্প-ব্যবসায়ী সংগঠনের নির্বাচনে কুশীলব হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি।
সমালোচনা ও প্রশ্ন
ওসমান পরিবারের রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সহযোগী থেকে হঠাৎ বিএনপি-ঘেঁষা ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় এখন প্রশ্ন উঠছে—মোহাম্মদ আলী কি আবার নতুন কোনো রাজনৈতিক সমীকরণের স্থপতি হতে যাচ্ছেন ?
নাকি সময়ের বাস্তবতায় তিনি নিজের কৌশলগত অবস্থান বদলাচ্ছেন ধুরন্ধর এই মোহাম্মদ আলী ?
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহল এখন এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে।
শেষ কথা :
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে “নয় লাইখ্যা অথবা কিং মেকার” নামে পরিচিত মোহাম্মদ আলী সব সময় ছিলেন নেপথ্যের খেলোয়াড়। সময়ের পালাবদলে তিনি কাকে কখন কিভাবে “রাজা” বানান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।









Discussion about this post