নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ:
২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, আগুন, হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের হওয়া অসংখ্য মামলার মধ্যেই এবার “মামলা বাণিজ্য” নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে—কিছু মামলার বাদী আসামিদের সঙ্গে গোপন আতাত করে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েছেন।
এমনই এক আলোচিত উদাহরণ পাওয়া গেছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সম্পর্কিত মামলায়।
জানা গেছে, ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় বাদী একাধিক নোটারীর মাধ্যমে ধাপে ধাপে শতাধিক আসামিকে “ভুলবশত” যুক্ত করা হয়েছিল বলে দাবি করে তাদের অব্যাহতির আবেদন করেছেন।
মামলাটি দায়ের করেন আড়াইহাজার উপজেলা ছাত্রদলের ১নং আহবায়ক সদস্য রতন মিয়া (২৮)। তিনি জেলা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের রহমান জিকুর অনুসারী বলে জানা গেছে।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় রতন মিয়া ২৪৮ জনকে আসামি করে নারায়ণগঞ্জের বিজ্ঞ আমলী ৪নং আদালতে একটি পিটিশন মামলা দায়ের করেন। কিন্তু মামলার প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই একাধিক নোটারীর মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সময় আসামিদের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেন।
হলফনামাগুলোতে রতন মিয়া উল্লেখ করেন, “সম্পূর্ণ ভুল বুঝাবুঝির কারণে উক্ত আসামীগণকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারা প্রকৃতপক্ষে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাদের চার্জশিট থেকে অব্যাহতি পেলে আমার কোনো আপত্তি নেই।”
তিনি আরও অনুরোধ করেন, এসব আসামিকে যেন পুলিশ গ্রেফতার বা হয়রানি না করে।
তবে এ নিয়ে স্থানীয় মহলে উঠেছে নানা প্রশ্ন। অনেকে বলছেন, “ভুলবশত” ৩০-৪০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়া বাস্তবসম্মত নয়। বরং বাদী অর্থের বিনিময়ে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু আসামিকে মামলার তালিকা থেকে বাদ দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
নোটারী সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী,
গত বছরের ২০ নভেম্বর, বাদী এক হলফনামায় ১৫৫নং আসামি তমাল মোল্লা, ২৪৭নং আসামি হিমেল মোল্লা, ২৪৮নং আসামি মামুন মোল্লা ও ৮৪নং আসামি সালাম মোল্লার নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেন।
৮ অক্টোবর ও ২৬ অক্টোবর তারিখে আরও দুটি হলফনামায় আওয়ামী লীগ নেতা লাক মিয়া, আক্তারুজ্জামান সুমন, জাহাঙ্গীর আলম, ফয়সাল শাহরিয়ার হীরা, আজমীর ভূইয়া, সজিব, রাজিব মিয়া, মনির কমিশনারসহ প্রায় ১৫ জনের নাম বাদ দেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
পরবর্তীতে আরও একাধিক নোটারীতে ধারাবাহিকভাবে প্রায় ২৫ জনের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করেন তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “এ ধরনের ধাপে ধাপে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া মামলার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এর পেছনে আর্থিক লেনদেন বা রাজনৈতিক চাপ থাকতে পারে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের আশপাশে “মামলা বাণিজ্য” এখন প্রকাশ্য গোপন রূপে চলছে। বাদী ও আসামির মধ্যে সমঝোতা করে লাখ লাখ টাকায় নাম বাদ দেওয়ার ঘটনা নাকি অস্বাভাবিক নয়।
এ বিষয়ে জানতে মামলার বাদী রতন মিয়াকে ফোন করা হলে তিনি বলেন, “কিছুক্ষণ পর জানাচ্ছি।”
তবে পরবর্তীতে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
আইনজীবী মহলের একাংশ মনে করেন, আদালতের নজরদারি বাড়ানো না হলে এ ধরনের মামলা বাণিজ্য ভবিষ্যতে বিচার ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।









Discussion about this post