চট্টগ্রাম–ঢাকা পাইপলাইনে ডিজেল ঘাটতি: তিন কমিটির তদন্তেও রইল রহস্য
২ লাখ ৬২ হাজার লিটার প্যাকিং হিসেবে গণ্য,
১ লাখ ১২ হাজার লিটার ডিজেলের হদিস এখনো মিলেনি
তদন্ত কমিটির সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এক মাস
চট্টগ্রাম থেকে পাইপলাইনে কুমিল্লা ও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ডিপোতে ডিজেল পরিবহনে প্রায় সাড়ে তিন লাখ লিটারের অস্বাভাবিক ঘাটতি দেখা দিলেও এর নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও দিতে পারেনি রাষ্ট্রীয় অংশীদারত্বের বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান যমুনা অয়েল কোম্পানি।
বিষয়টি নিয়ে যমুনা অয়েল, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও দুই কমিটিই এখনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।
বিপিসির ১০ দিনের এবং মন্ত্রণালয়ের ১৫ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে এক মাস।
পাইপলাইন পরীক্ষামূলক চলাচলেই উধাও পৌনে চার লাখ লিটার
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ডিপো থেকে পাইপলাইনে কুমিল্লা ও ফতুল্লায় পাঠানো হয় ২ কোটি ৫৩ লাখ ৮ হাজার ৬৩ লিটার ডিজেল। পথে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখা যায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬৮ লিটার ডিজেল কম পাওয়া গেছে।
এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা ২ লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার ডিজেলকে ‘প্যাকিং অবস্থায় পাইপলাইনে রয়ে গেছে’ বলে ব্যাখ্যা দিয়েছে।
তবে অবশিষ্ট ১ লাখ ১২ হাজার ৫৬৪ লিটার ডিজেলের হদিস এখনও মেলাতে পারেনি যমুনা অয়েল।
‘তেল কোথাও যায়নি’—বিপিসি চেয়ারম্যান
ঘাটতির তথ্য প্রকাশ পেয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠার পর বিষয়টি নিয়ে জাগো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিপিসি চেয়ারম্যান মো. আমিন উল আহসান দাবি করেন— “তেল কোথাও যায়নি, সবই ট্যাংকে আছে। যমুনা অয়েলের তেল চুরির তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন হয়নি।”
তবে ক্যালিব্রেশন— অর্থাৎ ট্যাংকের ধারণক্ষমতা পরিমাপ— সঠিকভাবে হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট জবাব দিতে পারেননি। বিএসটিআইয়ের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
একাধিক কমিটি, ভিন্ন ফলাফলের আশঙ্কা
বিপিসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন—“একটি অভিযোগে একাধিক কমিটি হওয়ায় জটিলতা তৈরি হয়েছে। দুই কমিটির ফলাফল ভিন্ন হলে পুরো প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।”
তার দাবি, প্রকৃত সমস্যা ক্যালিব্রেশন রিপোর্টে। ভুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে তেল গায়েব করার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রথম ক্যালিব্রেশনে মিলল বড় ধরনের গরমিল
চিঠিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়—
জুলাইয়ে পাঠানো ১ কোটি ৪ লাখ ৮৫ হাজার লিটার ডিজেলের বিপরীতে পাওয়া যায় ১ কোটি ২ লাখ ১৭ হাজার লিটার—
ঘাটতি ২ লাখ ৬৮ হাজার ৬৯২ লিটার
পরের চালানে অতিরিক্ত পাওয়া যায় ৫ হাজার ৮৮৮ লিটার
দুই চালানে নেট ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ৬২ হাজার ৮০৪ লিটার, যা ‘প্যাকিং’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে
সেপ্টেম্বরের চালানে ফতুল্লায় আবারও কম পাওয়া যায় ১ লাখ ১২ হাজার ৫৬৪ লিটার
যমুনার অভ্যন্তরীণ কমিটি রি-ক্যালিব্রেশনের পর ঘাটতি দেখিয়েছে মাত্র ৭ হাজার ৭৭১ লিটার। যমুনার জেনারেল ম্যানেজার (এইচআর) মো. মাসুদুল হক বলেন—“প্রথম ক্যালিব্রেশনে বড় ভুল ছিল। ক্যালিব্রেটরদের শাস্তি হওয়া উচিত।”
তদন্ত কমিটির অগ্রগতি ধীর
যমুনা অয়েলের অভ্যন্তরীণ কমিটি: ৩ দিনে দেওয়ার কথা, দিয়েছে ২৫ দিনে
বিপিসির কমিটি: ১০ কার্যদিবস সময়, এক মাসেও প্রতিবেদন নেই
মন্ত্রণালয়ের কমিটি: ১৫ দিনের সময়, তারও বহু পরে এখনো প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ
মন্ত্রণালয় কমিটির আহ্বায়ক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন— “বুয়েটের অধ্যাপকসহ পুরো টিম বিষয়টি বিশদভাবে দেখছেন। দু-একদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে পারবো।”
পাইপলাইনে সাশ্রয় প্রত্যাশা, বিপত্তিতে প্রকল্প
চট্টগ্রাম–ঢাকা পাইপলাইন প্রকল্পের ব্যয় ৩ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকা। পুরোপুরি চালু হলে বছরে ২৩৬ কোটি টাকা সাশ্রয়ের আশা করছে বিপিসি। এখনো পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হচ্ছে পুরো সিস্টেম।
তবে পরীক্ষামূলক পর্যায়েই বড় অঙ্কের ডিজেল ঘাটতি প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
উপসংহার
অভিযোগের পর পরই গঠন করা হয়েছে তিনটি তদন্ত কমিটি। কিন্তু সময়সীমা অতিক্রম করেও কার্যকর ব্যাখ্যা বা চূড়ান্ত প্রতিবেদন না পাওয়া— এবং ক্যালিব্রেশন নিয়ে বড় ধরনের গরমিল— প্রশ্ন তুলছে পুরো পাইপলাইন ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে।
১ লাখ ১২ হাজার লিটার ডিজেলের হদিস না মেলা পর্যন্ত ‘তেল গায়েব’—অভিযোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে না যমুনা অয়েল কোম্পানি।
তবে সংশ্লিষ্ট নির্ভরশীল সূত্রের দাবি, পৌনে ৪ লাখ লিটার তেলচুরির নেপথ্যের মূল নায়ক গ্রীজার সেই ব্রাজিল বাড়ির টুটুল। ফতুল্লার লালপুরে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ব্রাজিল বাড়ি’ এখন যেন কৌতূহলের প্রতীক। বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনা শেষ হলেও রঙিন সেই বাড়িটি এখনও আলোচনায়—তবে এবার আলোচনায় ফুটবল নয়, এর মালিক জয়নাল আবেদীন টুটুলের তেলচুরির সাম্রাজ্য। একসময় যিনি ছিলেন যমুনা অয়েল কোম্পানির সাধারণ ক্যান্টিন বয়, আজ তিনি কোটি টাকার মালিক।
টুটুলের বাবা মো. রফিক ছিলেন যমুনা অয়েল কোম্পানির নিরাপত্তারক্ষী। বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক কোটায় অস্থায়ীভাবে ক্যান্টিন বয়ের চাকরি পান টুটুল। দৈনিক মজুরি ছিল মাত্র ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে তার ভাগ্যে আসে নাটকীয় পরিবর্তন—ক্যান্টিন বয় থেকে ডিপোর গ্রেজার (তেল মাপার অপারেটর) পদে উন্নীত হন, আর সেখান থেকেই শুরু হয় তার অস্বাভাবিক সম্পদ বৃদ্ধির গল্প।
উল্লেখিত পৌনে চার লাখ লিটার তেল চুরির নেপথ্যে নায়ক এই টুটুল যিনি উর্ধতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বিশাল এই তেলচুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে ব্যাপক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।
পৌনে চার লাখ লিটার বিশাল তেল চুরির ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড়ের পর সকল গণমাধ্যমে গডফাদার এই টুটুলকে ঘিরে প্রতিবেদন প্রকাশ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহ বিশেষ পেশার কিছু দালালের মাধ্যমে অত্যন্ত কৌশলে টুটুল নিজের পক্ষে সাফাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করায়। যা নিয়েও চলছে ব্যাপক সমালোচনা বিতর্ক।









Discussion about this post