নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে একটি মাদ্রাসার চার শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের অভিযোগ উঠেছে নূরে মদিনা তাহফিজুল কুরআন মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক শরীফুল ইসলাম ইব্রাহিমীমের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রভাবশালীদের নেতৃত্বে গোপনে একটি সালিশ বৈঠক করে শিক্ষককে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় এবং ওই অর্থের অংশ বিচারক ও স্থানীয় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীর মধ্যে বণ্টন করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরণ
আটি হাউজিং এলাকার জমজম টাওয়ারে অবস্থিত মাদ্রাসাটির কয়েকজন শিক্ষার্থী অভিযোগ করে, শিক্ষক শরীফুল নিয়মিতভাবে শিক্ষার্থীদের কক্ষে ডেকে নিয়ে যৌন নিপীড়ন করতেন। চার শিশু শিক্ষার্থীকে বলাৎকারের পর পঞ্চম এক শিক্ষার্থীকে ডাকার সময় ঘটনাটি প্রকাশ পায়।
১২ নভেম্বর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা স্থানীয় সাবেক কৃষক দল নেতা জাকির মোল্লাসহ এলাকাবাসীকে বিষয়টি জানান। পরে অভিযুক্ত শিক্ষককে আটক করে থানায় সোপর্দের প্রস্তুতি নিলেও মধ্যবর্তী সময় প্রভাবশালী দেলোয়ার ওরফে পল্টি দেলোয়ার নেতৃত্বে হাউজিং অফিসে একটি সালিশ বসে।
সালিশে জরিমানা ও অর্থ বণ্টনের অভিযোগ
সালিশে উপস্থিত ছিলেন জাকির মোল্লা, ফরিদ মাস্টার, জালালসহ কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের পিতা। বৈঠকে শিক্ষককে ৪ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী—চার ভুক্তভোগী পরিবারকে মোট ১ লাখ টাকা (প্রতি পরিবারকে ২৫ হাজার)
উপস্থিত কিছু গণমাধ্যমকর্মীকে ৩০ হাজার টাকা
বাকি অর্থ সালিশকারীদের মধ্যে ভাগ-বণ্টন করা হয়।
একটি পরিবার ক্ষতিপূরণের টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানালে গোপন এই সালিশের তথ্য প্রকাশ্যে আসে।
ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষোভ
এক ভুক্তভোগীর অভিভাবক বলেন,
“এ ধরনের জঘন্য অপরাধ টাকার বিনিময়ে মিমাংসা করা যায় না। অপরাধীর কঠোর শাস্তি হওয়া উচিত।”
অভিযুক্ত শিক্ষক ও স্থানীয়দের বক্তব্য
অভিযুক্ত শিক্ষক শরীফুল আগে ২০২০ সালেও একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজত বাস করেছিলেন। জামিনে ছাড়া পাওয়ার পর তার আচরণে পরিবর্তন হয়নি বলে জানায় স্থানীয়রা।
তার পিতা সামসুল হক তালুকদার বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করে দেলোয়ার ও ফরিদ মাস্টারের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ফরিদ মাস্টার দাবি করেন, পুলিশই নাকি তাদের বিষয়টি “সামাজিকভাবে সমাধান” করার পরামর্শ দেয়।
দেলোয়ার বলেন, “জোহরের নামাজের পর কিছু ছেলে শিক্ষককে ধরে অফিসে নিয়ে আসে। পরে জরিমানা করে মিমাংসা করা হয়।”
পুলিশের অবস্থান
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি শাহিনূর আলম বলেন,
“এ ধরনের ঘটনায় সামাজিকভাবে মীমাংসার পরামর্শ দেওয়া ঠিক হয়নি। ভুক্তভোগীরা লিখিত অভিযোগ দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য
শিশু অধিকার কর্মীদের মতে, শিশু বলাৎকার একটি অ-সমঝোতাযোগ্য অপরাধ, যা সালিশ বা আর্থিক লেনদেনে মীমাংসা করা আইনগতভাবে দণ্ডনীয়। এই ঘটনায় জড়িত সবার বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত।
সিদ্ধিরগঞ্জের এ ঘটনাটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ নয়—বরং অপরাধকে আড়াল করতে প্রভাব, অর্থ আর সালিশ সংস্কৃতির অপব্যবহারের উদ্বেগজনক উদাহরণ। ভুক্তভোগী পরিবার অভিযোগ দিলে আইনগতভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠছে সর্বমহলে।









Discussion about this post