নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সভাপতি ও কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের বিতর্কিত চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ বাদল পালিয়ে যাওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে।
এলাকাবাসীর দাবি—বাদলের পতনের পরও তার ‘প্রভাবশালী সহযোগীরা’ এখনো এলাকায় সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, বাদলের তিন ঘনিষ্ঠ সহযোগী—সাইদুর রহমান সুমন, অশোক কুমার সরকার এবং রঞ্জিত মণ্ডল—বিগত সরকারের আমলে এলাকায় বিভিন্নভাবে ভূমিদস্যুতা, অনিয়ম-অপরাধ, চাঁদাবাজি ও প্রভাব বিস্তারের সাথে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
বাদলের পলায়ন ও আলোচনা
গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের পর ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেশ ছাড়েন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর তার ঘনিষ্ঠ অনেক সংসদ সদস্য ও নেতার মতো সাইফুল্লাহ বাদলেরও আত্মগোপনে চলে যাওয়ার খবর পাওয়া যায়।
এই সাইফুল্লাহ বাদলের বিরুদ্ধে চুরি, লাম্পট্ট, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভূমিদস্যুতা, দখলদারি, নারী কেলেঙ্কারিসহ গুরুতর অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে।
২০০১ সালে অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের পতনের পর এই সাইফুল্লাহ বদল নারি কেলেঙ্কারি করে এলাকাবাসীর রোশনলে পড়ে কাশিপুর ছেলে পালিয়ে যায়। তৎসময়ে এই সাইফুল্লাহ বাদলকে নারী নানাভাবে সহায়তা করে আশ্রয় দেয় গিয়াস উদ্দিন ওরফে চোরা গেসু। সেই কৃতজ্ঞতা থেকে গিয়াসউদ্দিন ওরফে চোরা গেসুকে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের কমিটিতে স্থান দেয় সাইফুল্লাহ বাদল। এরপর ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত লুট পাটের চরম নগ্নতা দেখায় বাদল ও গেসু চক্র। এই চক্র বিদ্যুৎ ও গ্যাস চুরিসহ সরকারি সম্পত্তির লুটপাট করে বর্তমানে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক।
স্থানীয় সূত্রের দাবি—তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে ঢাকায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন। একই সাথে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ করে থানা পুলিশকে নিয়মিত মোটা অংকের টাকা দিয়ে গ্রেফতার এড়িয়ে যাচ্ছে বাদল ও গিয়াস উদ্দিনের পরিবার।
সুমনের বিরুদ্ধে জমি লেনদেনে আধিপত্যের অভিযোগ
এলাকাবাসীর দাবি, বাদলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাইদুর রহমান সুমন স্থানীয় জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতেন।
সূত্রের ভাষ্য, উত্তর নরসিংপুর, চর কাশীপুর, দিগুলী পট্টি ও চর রাজাপুর এলাকায় বহুদিন ধরে সুমনের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি করা কঠিন ছিল। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন—তিনি “দাম্ভিক আচরণ” করতেন এবং জমিকে কেন্দ্র করে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলার অভিযোগ থাকলেও তিনি এখনো গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হয়েছেন বলে দাবি মানুষের।
অশোক কুমার সরকারের বিরুদ্ধে ‘রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার’ অভিযোগ
স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, কাশীপুর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অশোক কুমার সরকার বাদলের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে দ্রুত এলাকায় প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন।
সূত্রগুলোর দাবি—বাদলের অনুকূলে থাকতে তিনি আর্থিক সহায়তা দিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিতেন। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য হওয়ার লক্ষ্যেও তিনি বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বর্তমানে দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় ২ নম্বর ওয়ার্ডে রাজনৈতিক সংগঠন পুনর্গঠনের নামে অশোক বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের পরিকল্পনা করছেন বলে দাবি স্থানীয়দের।
রঞ্জিত মণ্ডলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
এনায়েতনগর এলাকার ১২৩ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রঞ্জিত মণ্ডল–এর বিরুদ্ধে বাদলের সাপোর্টে গাইবান্ধা বাজার ও আশপাশের এলাকায় একক প্রভাব প্রতিষ্ঠার অভিযোগ রয়েছে।
এলাকাবাসীর দাবিতে, গার্মেন্টস ওয়েস্টেজ, জমি ব্যবসা ও বিভিন্ন আড়তের নিয়ন্ত্রণে তিনি বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব বজায় রেখেছিলেন এবং এসব খাত থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ উপার্জন হতো। স্থানীয় ভাষ্যে—এই আয়ের একটি অংশ বাদলের কাছেও যেত।
এলাকাজুড়ে উত্তেজনা, পুলিশের হস্তক্ষেপ দাবি
বাদল পালিয়ে যাওয়ার পর তার প্রভাবশালী সহযোগীরা এলাকায় থেকে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে বলে দাবি এলাকাবাসীর।
তাদের বক্তব্য—বিগত সরকারের সময় যেভাবে প্রভাব বিস্তার করা হতো, এখনো তার প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে।
স্থানীয়রা তাই জেলা পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ চেয়ে অভিযোগিত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। এলাকাবাসীর মতে, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মন্তব্য
এই বিষয়ে পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য দেয়নি। তবে তারা জানিয়েছে—অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপসংহার
কুখ্যাত অপরাধী সাইফুল্লাহ বাদল ওরফে সাউ বাদলের পলায়ন এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে ফতুল্লা ও কাশীপুর অঞ্চলে অস্থিরতা বাড়ছে। অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে স্থানীয়রা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা করছেন।
(বাদল ওরফে সাউ বাদলসহ পুরো চক্রের বিস্তারিত ধারাবাহিক প্রতিবেদন আসছে । চোখ রাখুন নারায়ণগঞ্জ নিউজ আপডেট এ)









Discussion about this post