রূপগঞ্জ প্রতিনিধি : (২১ নভেম্বর)
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ভূমিকম্পের সময় সড়কের পাশের দেয়াল ধসে এক বছরের কন্যাশিশু ফাতেমার মৃত্যু হয়েছে।
গুরুতর আহত হয়েছেন তার মা কুলসুম বেগম ও প্রতিবেশী জেসমিন বেগম।
আর হাসপাতালে শয্যা না পাওয়ায় পুরো দিনজুড়ে রুগ্ন স্ত্রীকে নিয়ে চিকিৎসার জন্য দৌড়াচ্ছেন শিশুটির বাবা আব্দুল হক।
আজ শুক্রবার বিকেলে ছোট্ট ফাতেমার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু তাঁকে শেষবার কোলে নিতে পারেননি মা–বাবা। মা কুলসুম এখনো অচেতন, আর বাবা আব্দুল হক ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে—চিকিৎসার আশায়।
“আমার সোনার বাংলাদেশে গরিবের চিকিৎসা নাই” – শিশুটির খালু
ফাতেমার খালু মোহাম্মদ হোসেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “দুপুর থেইকা ঘুরতেছি। ঢাকা মেডিকেলে ওয়াশ-ড্রেসিং করে বলে সিট নাই, বাড়ি নিয়্যা যান। মাথায় এমন আঘাত, হুঁশ নাই—তারে কেমনে বাড়ি নেই ? তিনটা জায়গায় গিয়াও ভর্তি করাইতে পারতেছি না। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের চিকিৎসা নাই।”
দিনভর তারা ইউএস বাংলা মেডিকেল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বেসরকারি ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালে গিয়ে ফিরে আসেন। কোথাও শয্যা নেই, কোথাও ভর্তি নিতে “অক্ষমতা”—এই ধাক্কায় দিশেহারা পরিবারটি।
শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকের পরামর্শে তারা আগারগাঁওয়ের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস ও হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই অ্যাম্বুলেন্সের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে মোহাম্মদ হোসেন বলেন, “ওইখানে যাওয়ার আগেই আমার শালি বাঁচে কিনা শিওর না।”
দেয়াল ধস—মুহূর্তেই বদলে দিল তিন পরিবারের জীবন
শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে নারায়ণগঞ্জ। সেই সময় ভুলতা গাউছিয়া যাওয়ার পথে সড়কের পাশের একটি দেয়াল হঠাৎ ভেঙে পড়ে। মুহূর্তেই চাপা পড়ে যায় ছোট্ট ফাতেমা, তার মা কুলসুম এবং প্রতিবেশী জেসমিন।
স্থানীয়দের ভাষায়—“ভূমিকম্প থামতেই দেখি ধুলোয় ঢেকে আছে সব। দৌড়ায়ে গিয়ে দেখি বাচ্চাটা আর নেই।”
ফাতেমাকে ঘটনাস্থল থেকেই মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গুরুতর আহত দুই নারীকে স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়া হয়।
“ভূমিকম্পে দেয়াল ধসেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে” – পুলিশ
ভুলতা পুলিশ ফাঁড়ির পরিদর্শক মোখলেসুর রহমান জানান, “ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে ফাতেমা নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তার মা ও প্রতিবেশী গুরুতর আহত।”
একটি দেয়াল, কয়েক সেকেন্ড, আর নিভে যাওয়া একটি জীবন
এক বছরের শিশু ফাতেমা—যার হাঁটতে শেখাই হয়নি ঠিকমতো। যে মা কুলসুম এখনো সংজ্ঞাহীন, জানেই না তার কোলে থাকা শিশুটি আর পৃথিবীতে নেই।
আর বাবা আব্দুল হক—যিনি নিজের শিশুকে দাফন করতেও যেতে পারেননি, কারণ তিনি স্ত্রীকে বাঁচানোর দৌড়ে ব্যস্ত।
যা বারবার প্রশ্ন তোলে
ভূমিকম্পে নড়বড়ে দেয়াল ধসে এমন মৃত্যু কেন হবে ? জরুরি রোগীর জন্য হাসপাতালে শয্যা না পাওয়া—কীভাবে সম্ভব ? দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা কি সত্যিই এত কঠিন ?
শেষ কথা
ফাতেমার মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়—এটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও অবহেলার নগ্ন সত্যকে আবারও সামনে আনে।
একটি পরিবার আজ ভেঙে পড়েছে।
একটি মা-বাবা তাঁদের সন্তানকে হারিয়েছেন।
আর চিকিৎসার অভাবে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে আরেকজন মা।
এই ঘটনাটি শুধু সংবাদ নয়—মানবিকতার এক গভীর পরীক্ষা।









Discussion about this post