স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে দফায় দফায় ভূমিকম্পে কেঁপে উঠছে জনজীবন। মাত্র দুই দিনের মধ্যে একাধিক কম্পন অনুভূত হওয়ায় সারাদেশে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আতঙ্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন ধারাবাহিক ভূমিকম্প ভূ-পৃষ্ঠের নড়াচড়ার একটি অস্থিতিশীল অবস্থার ইঙ্গিত হতে পারে, যা দুর্যোগ প্রস্তুতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
এক সেকেন্ড ব্যবধানে দুটি ভূমিকম্প
আজ শনিবার (২২ নভেম্বর) সন্ধ্যায় প্রায় একই সময়ে দুটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ তরিফুল নেওয়াজ কবির গণমাধ্যমকে জানান—
প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৩.৭, যা অনুভূত হয় ঢাকার বাড্ডা এলাকায়।
ঠিক এক সেকেন্ড পরই দ্বিতীয় ভূমিকম্পটি আঘাত হানে নরসিংদীতে, যার মাত্রা ৪.৩।
দ্বিতীয় কম্পনের উৎসস্থল নরসিংদী বলে নিশ্চিত করা হলেও বিস্তারিত তথ্য এখনো জানা যায়নি বলে অধিদপ্তর জানিয়েছে।
দুই দিনে চার বার কম্পন
এর আগে একই দিন সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে নরসিংদীর পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার আরও একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়।
তারও আগে শুক্রবার (২১ নভেম্বর) দেশের বড় অংশে অনুভূত হয় ৫.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, যার উৎস ছিল নরসিংদীর মাধবদী। শক্তিশালী ওই কম্পনে দেশজুড়ে অন্তত ১০ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
ধারাবাহিক ভূমিকম্পের কারণ কী ?
সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো ঘন ঘন হওয়ায় বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা চলছে। সম্ভাব্য ব্যাখ্যা—
1. ভূমিকম্প সক্রিয়তার বৃদ্ধি: বঙ্গ–ভারত প্লেট সীমান্তে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমে থাকলে ছোট-বড় ধারাবাহিক ভূমিকম্প হতে পারে।
2. ফল্ট লাইনে নড়াচড়া: নরসিংদী অঞ্চলের সক্রিয় ফল্টলাইনে সাম্প্রতিক চাপ সঞ্চয়ন বা মুক্তির ঘটনার ইঙ্গিত হতে পারে।
3. অগভীর উৎসস্থল: অধিকাংশ কম্পনের উৎসস্থল তুলনামূলক অগভীর হওয়ায় রাজধানীসহ আশপাশের জেলাগুলো তীব্রভাবে অনুভব করছে।
জনমনে আতঙ্ক, ভবন ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
দফায় দফায় কম্পন হওয়ায় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত অবস্থায় আছে। প্রতিটি কম্পনের পরই বাড়ি-ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে বাসিন্দারা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও উদ্বেগ বেড়েছে—ভূমিকম্প কি আরও বড় কোনো ঘটনার ইঙ্গিত?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন:
ঢাকার ভবনগুলোর বড় অংশ ভূমিকম্প সহনশীল নয়, পুরনো ভবন ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, প্রয়োজন জরুরি পুনর্মূল্যায়ন ও ভবন নিরাপত্তা অডিট।
প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট, ঘন ঘন ভূমিকম্পের পরও, উদ্ধার মহড়া, বিপদ সংকেত ব্যবস্থা, নাগরিক সচেতনতা, ভবন নিরাপত্তা মনিটরিং
এসব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি তেমন নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞদের মতে, “বড় ধরনের কম্পন হলে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভয়াবহ হতে পারে।”
প্রতিরোধ ও প্রস্তুতি: করণীয় কী ?
সরকারের করণীয় : বড় শহরগুলোতে ভবন নিরাপত্তার বাধ্যতামূলক পরিদর্শন, সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার তালিকা তৈরি, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে জরুরি প্রতিক্রিয়া দল সক্রিয়করণ,
স্কুল-কলেজে নিয়মিত ভূমিকম্প মহড়া।
নাগরিকদের করণীয় : আতঙ্ক নয়, বরং সচেতনতা, ঘরের ভিতরে ভারী জিনিস নিরাপদে স্থাপন,
জরুরি নির্গমন পরিকল্পনা তৈরি,
ভূমিকম্পের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয়—যেমন টেবিলের নিচে বা দেয়ালের কোণে দাঁড়ানো।
উপসংহার
বারবার ভূমিকম্পের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। নরসিংদী–ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান ও জনঘনত্ব বিবেচনায় ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। এ অবস্থায় প্রয়োজন—
প্রস্তুতি বৃদ্ধি, ভবন নিরাপত্তায় কঠোর নজরদারি, এবং জাতীয়ভাবে ভূমিকম্প দুর্যোগ মোকাবিলা পরিকল্পনার বাস্তবায়ন।
সাম্প্রতিক ধারাবাহিক ভূমিকম্পগুলো দেশের দুর্বল প্রস্তুতিকে আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।









Discussion about this post