নারায়ণগঞ্জ রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে মোহাম্মদ আলীর আকস্মিক রাজনৈতিক সক্রিয়তা। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার স্বপ্নে তাঁর প্রকাশ্য তৎপরতা দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে—মোহাম্মদ আলী কখনোই বিএনপির আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন না; বরং দীর্ঘ সময় ধরে তিনি সুবিধাভোগী হিসেবেই পরিচিত।
ওসমান পরিবারের আশ্রয়ে সুবিধা—বিএনপির অভিযোগ
বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, যখন দলীয় নেতারা ‘স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের’ বিরুদ্ধে রাস্তায় থেকে হামলা–মামলা মোকাবিলা করেছেন, তখন মোহাম্মদ আলী ছিলেন নিরাপদ দূরত্বে। বরং নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ‘গডফাদার’ হিসেবে পরিচিত ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে ব্যবসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষা করেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ—এই ঘনিষ্ঠতার পুরস্কার হিসেবেই তিনি পরবর্তীতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের পদ পেয়েছেন এবং বিভিন্ন সময়ে ওসমান পরিবার বিপদে পড়লে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে পাশে দাঁড়িয়েছেন।
এমনকি ওসমান পরিবারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বিপর্যয় এবং বিদেশে চলে যাওয়ার পরও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও প্রভাব রক্ষায় মোহাম্মদ আলীর অস্বাভাবিক তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
দলের সংকটে অনুপস্থিত, আজ মনোনয়ন চাই—নেতাকর্মীদের ক্ষোভ
বিএনপির মাঠপর্যায়ের বহু নেতা মনে করেন, কঠিন সময়ে আন্দোলনকে ধরে রাখতে তাদের ব্যক্তিগত, পেশাগত ও পারিবারিক ক্ষতি হয়েছে।
তাদের ভাষায়—“আমরা রাস্তায় লাঠি খেয়েছি, মামলা খেয়েছি, আর উনি এসি রুমে বসে ওসমানদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করেছেন!”
স্থায়ী কমিটির নির্দেশিত ৩১ দফা বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিতে যেখানে প্রকৃত নেতা-কর্মীরা দিনরাত ছুটছেন, সেখানে হঠাৎ মোহাম্মদ আলীর আবির্ভাব পড়ে থাকা ক্ষতকে আরও উস্কে দিয়েছে।
আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী, পরে নামমাত্র এমপি—এখন আবার মনোনয়ন ?
নেতাকর্মীরা মনে করিয়ে দিয়েছেন—
১৯৯১ সালে তিনি বিএনপির নিজস্ব প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে দলীয় মনোনয়ন পেলেও মাত্র ১৫ দিন এমপি থেকে কোনো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছাড়াই আড়ালে চলে যান।
দীর্ঘ দুই দশক দলের মাঠের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার পর এখন তাঁর মনোনয়ন দাবি—তাদের মতে “রাজনৈতিক ভণ্ডামির চরম উদাহরণ”।
অভিযোগ : জমি বাণিজ্য, সুযোগসন্ধানী সম্পর্ক ও সাধারণ মানুষের ক্ষতি
বহু স্থানীয় নেতা অভিযোগ করেছেন, মোহাম্মদ আলীর রাজনৈতিক আগ্রহের পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো বড় বড় প্রকল্পের জমি কেনাবেচা, শিল্পপতিদের সন্তুষ্ট রাখা এবং ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য শক্তিশালী করা।
কেউ কেউ সরাসরি বলেছেন—“এমন ব্যক্তি ইউপি নির্বাচনেও জয় পাবেন কি না সন্দেহ—এমপি তো দূরের কথা।”
পরিবারের অতীত ‘দলবদল’ নিয়েও প্রশ্ন
অভিযোগ রয়েছে—মোহাম্মদ আলীর পরিবার অতীতে নারায়ণগঞ্জের তৎকালীন চেয়ারম্যান লিটন উৎপলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিল। এলাকাবাসীর ভাষ্য—পঞ্চবটি ও শিশমহলের এলাকায় তাঁর আত্মীয়-স্বজনদের বিরুদ্ধে অতীতের জুলুম-নিপীড়নের স্মৃতিও এখনো তাজা।
ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠদের উপস্থিতি—ক্ষুব্ধ শহীদ পরিবার ও জুলাই আন্দোলনের আহতরা
সর্বশেষ, তাঁর সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে ওসমান পরিবারের দোসর ও বৈষম্যবিরোধী মামলার বহু বিতর্কিত আসামিকে দেখা যাওয়ায় ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে। শহীদ পরিবার ও জুলাই আন্দোলনে আহতদের অনেকে বলেছেন—“এটি প্রমাণ করল—মোহাম্মদ আলী ওসমানদেরই লোক। তাঁর রাজনীতি সুবিধাবাদী, দলীয় নয়।”
সারসংক্ষেপ
নারায়ণগঞ্জ বিএনপির তৃণমূলের প্রশ্ন এখন একটাই—“যিনি দলকে কখনোই সঙ্কটে সঙ্গ দেননি এবং বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন, তিনি কী করে হঠাৎ এমপি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন ?”
মাঠপর্যায়ে তৈরি আস্থাহীনতা, ওসমান পরিবারের ছায়া এবং অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে মোহাম্মদ আলীর মনোনয়ন আকাঙ্ক্ষাকে অনেকেই দেখছেন “রাজনৈতিক অযৌক্তিকতা ও সুযোগসন্ধানী উচ্চাভিলাষ” হিসেবে।









Discussion about this post