সারা দেশের মতো সকল দলের রাজনীতি একই দাঁড়ায় পরিচালিত হলেও নারায়ণগঞ্জের চিত্র ভিন্ন। এক অদ্ভুত রাজনৈতিক গ্যারাকলে চলছে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি।
বিশেষ করে আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের শাসনামলে ওসমান পরিবারের করাল গ্রাস থেকে মুক্তি পাইনি নারায়ণগঞ্জের কেউ। ব্যবসা-বাণিজ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হাট, ঘাট, মাঠ, ভূমি কার্যালয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সকল দপ্তরকে কঠোর হস্তে নিয়ন্ত্রণ (জিম্মি)) করত ওসমান পরিবারের সদস্য ছাড়াও চেলা চামচারা ।
২০২৪ সালের ৫ ই আগস্ট গণঅভ্যুথানের পর আওয়ামী লীগের শাসনামলের প্রথম ঘটলে নারায়ণগঞ্জের সকল শ্রেণীর মানুষের মাথার উপর থেকে যেন এক অদৃশ্য অশুভ শক্তি সরে যায় – এমন ধারণা ছিল সকলের।
কিন্তু এমন ধারণার কিছুদিনের মধ্যেই সেই ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অদৃশ্য ও কালো থাবা দেখতে পাচ্ছে নারায়ণগঞ্জবাসী !
নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ওসমান ঘনিষ্ঠদের মনোনয়ন—বিক্ষুব্ধ ভোটারদের তীব্র প্রতিক্রিয়া
নারায়ণগঞ্জে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। বহু বছর ধরে আলোচিত–সমালোচিত ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনকে বিএনপির মনোনয়ন প্রদান এবং কয়েকজনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জেলার রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে। সচেতন নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করে—নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও অতীত বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক মাঠে উপস্থিতি ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক
বিএনপি ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জ–১ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু এবং নারায়ণগঞ্জ–৫ আসনে শিল্পপতি মাসুদুজ্জামান মাসুদ ওরফে মডেল মাসুদকে মনোনয়ন দিয়েছে—যাদের দুজনই ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।
দলীয় নেতাকর্মী ও তৃণমূলে দীর্ঘদিন সংগ্রাম করা কর্মীদের একটি অংশ অভিযোগ করছেন, “এরা কখনো আন্দোলনে ছিল না, অথচ দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে হঠাৎ করেই মনোনয়ন পাচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও সুবিধাভোগীরা।”
তৃণমূল নেতাদের ভাষ্য—গত ১৫ বছরে বিএনপির আন্দোলন–সংগ্রামে মডেল মাসুদের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে, অথচ ব্যবসায়িক পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি এখন ‘মনোনয়ন প্রার্থী’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। এতে হতাশা ও ক্ষোভ আরও বাড়ছে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবেও আসছে ওসমান ঘনিষ্ঠরা
নারায়ণগঞ্জ–৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও কথিত ‘কিং মেকার’ ৯ লাইখ্যা ডাকাত সর্দার হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত নানাভাবে বিতর্কিত ওসমানীয় দালাল মোহাম্মদ আলী।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের শাসনামলে কুখ্যাত গডফাদার শামীম ওসমানের শিষ্য হিসেবে পরিচিত যিনি নিজেকে শামীম ওসমানকে ”পীর সাহেব” বলে বলে ডাকতেন সেই ফতুল্লার কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম সেন্টু সম্প্রতি ধানের শীষের পোস্টারে পোস্টারে পুরো ফতুল্লা অঞ্চল ছেয়ে ফেলেছেন।
গডফাদার শামীম ওসমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন সেই কুখ্যাত ডাকাত সর্দার ৯ লাইখ্যা খ্যাত মোহাম্মদ আলী ও মনিরুল ইসলাম সেন্টুর ধানের শীষের হাজার হাজার পোস্টার দেখে হতবাক হয়ে পড়েছেন নগরবাসি।
স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, দীর্ঘদিন তিনি ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ৫ আগস্টের পরেও পর্দার আড়ালে বিভিন্ন প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। মূলত ওসমানীয় প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী মোহাম্মদ আলী মাঠ দখলে রাখতে এবং ফেলে যাওয়া ওসমানীয় সাম্রাজ্য রক্ষনাবেক্ষণ করতে এই ছক তৈরি করে।
সাধারণ ভোটারদের অস্বস্তি ও ক্ষোভ
সচেতন নাগরিক সমাজের অভিযোগ—বহু বছর ধরে নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাস, দখলদারিত্ব ও ভয়ের রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠা ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠরা এখন নতুন রাজনৈতিক ব্যানারে হাজির হচ্ছেন। অনেকেই মনে করেন, “স্বৈরশাসনের সময় যাদের প্রভাব চরম ছিল, তাদের উপস্থিতি ভোটের মাঠকে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে।”
ভোটারদের একটি অংশ জোরালো ভাষায় বলছে—“নারায়ণগঞ্জ আর কখনো সন্ত্রাসের রাজত্ব চায় না। ওসমান পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত যেকোনো ব্যক্তিকে জনসমর্থন দেওয়া হবে না।”
পুরোনো বিতর্কে ফের আলোচনায় মোহাম্মদ আলী
মোহাম্মদ আলীর বিভিন্ন সময়ে ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠতায় অংশ নেওয়ার ঘটনাগুলো আবার আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে ‘৯ লাইখ্যা ডাকাত’ ও সম্প্রতি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার পর বিএনপির কর্মী–সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া এবং পরবর্তীতে তার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হওয়া ঘটনাটি এখনো সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
দিপু ভূঁইয়ার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক মহলের আলোচনায় আরও উঠে এসেছে—৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে ওসমান পরিবার আত্মগোপনে যাওয়ার সময় দিপু ভূঁইয়ার সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ, যা স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের নজরে এসেছে। বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার পর এ বিষয়টি টক-অফ-দ্য-টাউনে পরিণত হয়েছে।
সার্বিক পর্যবেক্ষণ
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে ওসমান পরিবারের প্রতিচ্ছায়া এখনো গভীরভাবে প্রভাব বিস্তার করছে—এমনটাই মনে করছেন অনেক পর্যবেক্ষক।
ভোটারদের দাবি, “যে-ই আসুক, যেই দলের হোক—স্বৈরাচার, সন্ত্রাস ও ক্ষমতার রাজনীতির দোসরদের আর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে স্থান দেওয়া যাবে না।”
আসন্ন নির্বাচনে এই ক্ষোভ–অসন্তোষ ভোটের ফলাফলে কীভাবে প্রতিফলিত হবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।









Discussion about this post