নিজস্ব প্রতিবেদক :
শীত আসতেই নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকে গুড়ের চাহিদা। পিঠা-পুলির মৌসুমে আখ ও খেজুরের খাঁটি গুড়ের কদর থাকে তুঙ্গে। সুযোগ বুঝে কিছু অসাধু কারখানায় চলছে ভয়াবহ ভেজাল গুড় তৈরির কারসাজি। রাজশাহীর বাঘায় র্যাবের সাম্প্রতিক অভিযানে এমন একাধিক কারখানার সন্ধান মিলেছে, যেখানে আখ বা খেজুরের রসের কোনো ব্যবহারই নেই। শুধু চিনি, কাপড়ে দেওয়া রঙ, আটা, হাইড্রোজ, গ্যাস পাউডার, চুনসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করা হচ্ছে ‘খাঁটি গুড়’-এর নামে ভয়ংকর ভেজাল পণ্য।
নারায়ণগঞ্জের বাজারেও যায় এসব গুড়
রাজশাহীর শাহাপুর এলাকার এসব কারখানায় তৈরি হওয়া ভেজাল গুড় প্রতি মৌসুমে পাইকারদের মাধ্যমে ঢুকে পড়ে রাজধানীর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের পাইকারি হাট ও খুচরা মার্কেটগুলোতে। শীতের মৌসুমে চাহিদা বাড়ায় এখানে গুড়ের সরবরাহও বেড়ে যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অনেকে অজান্তেই এসব ভেজাল গুড় কিনে বাজারে আনেন। ফলে ক্রেতারা খাঁটি গুড়ের নামে কিনছেন স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক মেশানো পণ্য।
র্যাবের অভিযান, জরিমানা ও স্বীকারোক্তি
বুধবার সকালে র্যাব বাঘা উপজেলার আড়ানীতে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ ভেজাল গুড় ও চিনি জব্দ করে। দুটি কারখানার মালিক লাকি ও সান্টুকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। সরেজমিনে দেখা যায়—কড়াইয়ে গলানো চিনি ও রঙ মিশিয়ে গুড় তৈরি হচ্ছে। আখ বা খেজুরের রসের কোনো অস্তিত্ব নেই।
কারখানার মালিক নানটু মিয়া পালিয়ে গেলেও তার স্ত্রী লাকি অকপটে স্বীকার করেন, “এ গুড়ে কোনো রস নেই। শুধু চিনি, রঙ, আটা, হাইড্রোজ, গ্যাস পাউডার, চুন মিশিয়েই আখ ও খেজুরের গুড় বানানো হয়।” এসব গুড় পাঠানো হয় রাজশাহী, নাটোর, পাবনা—এবং সেখান থেকে দেশের বিভিন্ন বাজারে।
ভেজাল এই গুড় তৈরির শ্রমিকরা বলেছেন, শুধু এই অঞ্চলেই না, যশোর, মাগুরা, কুষ্টিয়া, ছাড়াও কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া অসংখ্য ভেজাল গুড়ের কারখানা রয়েছে। আর এই ভেজাল গুড়ের মূল মোকাম নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পাইকারি বাজার। নারায়ণগঞ্জের পাইকারি বাজার থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয় ভেজাল এই গুড়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ভয়াবহ
রাসায়নিক মেশানো এসব গুড় শিশুদের জন্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর বলে জানিয়েছেন রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস। তিনি বলেন, “হাইড্রোজ, কেমিক্যাল বা রঙ মেশানো কোনো খাবারই স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ নয়। দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের ভেজাল খাবার ক্যানসারসহ জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।”
নারায়ণগঞ্জে কড়াকড়ি নজরদারির দাবি
নারায়ণগঞ্জের ভোক্তাদের দাবি—শীতের মৌসুমে ভেজাল গুড়ের বিরুদ্ধে প্রশাসনের বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। পাইকারি বাজারে নমুনা পরীক্ষা, নিয়মিত অভিযান এবং সরবরাহ চেইনে কঠোর পর্যবেক্ষণ বাড়ানো জরুরি।
ভোক্তা অধিকার, র্যাব ও জেলা প্রশাসনের সমন্বিত অভিযানে এ ধরনের কারখানা চিহ্নিত ও ধ্বংস না করলে পিঠার মৌসুমে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়বে লাখো মানুষ।
ভোক্তাদের সতর্কবার্তা :
খাঁটি গুড়ের রঙ কখনোই উজ্জ্বল বা অস্বাভাবিক চকচকে হয় না; গন্ধ থাকে প্রাকৃতিক। সন্দেহ হলে কেনার আগে অবশ্যই গুড় ভেঙে ভিতরের রঙ দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শীতের এই মৌসুমে ভেজাল গুড়ের ভয়াবহতার বিরুদ্ধে সচেতনতা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপই পারে ক্রেতাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।









Discussion about this post