নিজস্ব প্রতিবেদক :
বন্ধুত্ব নাকি মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়—সিদ্ধিরগঞ্জের তরুণ তাকবির আহমেদ (২২) যেন তার উল্টো চিত্রই দেখালেন। মাদক সেবন আর অনলাইন জুয়ার টানাপোড়েনে জড়িয়ে বন্ধুদের হাতে শেষ পর্যন্ত জীবনটাই হলো বাজিতে—এমনই চিত্র তুলে ধরেছে পিবিআই নারায়ণগঞ্জের তদন্ত।
আজ শনিবার (২৯ নভেম্বর) এক প্রেস ব্রিফিংয়ে পিবিআই পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ জানালেন, এই ‘বন্ধুসুলভ’ হত্যাকাণ্ডের পরদিনই আটক করা হয়েছে দুই আসামিকে। উদ্ধার হয়েছে তাকবিরের মোবাইল ফোনও—যেটি হত্যার পর মুক্তিপণ দাবি করতে ব্যবহৃত হয়েছিল, যেন নাটকের শেষ অঙ্কটুকুও অপূর্ণ না থাকে।
এর আগের দিন, ২৬ নভেম্বর, ওয়াপদা কলোনীর পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিত্যক্ত ভবনের প্রথম তলা থেকে উদ্ধার হয় তাকবিরের মরদেহ। পরিবার আগের রাতেই তাকে হারিয়েছিল; এলাকাবাসী পরদিন মরদেহ খুঁজে পেয়ে নিশ্চিত করে সেই হারানোর নির্মম সত্য।
তদন্তে বেরিয়ে আসে আরেক চমকপ্রদ দৃশ্যপট—বিদেশ যাওয়ার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, বেকার অবস্থায় বাড়িতে থাকা তাকবির ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় বের হয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু সেই বের হওয়া আর ফেরার জন্য ছিল না। প্রযুক্তি বিশ্লেষণ ও মাঠতদন্তে পিবিআই নিশ্চিত হয়—তার ‘বন্ধু’ মো. হারুন (৩৪) ও মো. রফিকুল (৩৮) এর হাতেই লেখা হয়েছে এই হত্যার রূপরেখা।
২৭ নভেম্বর সোনারগাঁওয়ের লাঙ্গলবন্দ এলাকায় হারুনকে এবং তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ওয়াপদা কলোনী মোড় থেকে রফিকুলকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। এরপর রফিকুলের ঘরের সিলিং থেকে উদ্ধার হয় তাকবিরের মোবাইল—যেন সুপারহিরো ছবির ভিলেনদের মতো শেষ ক্লাইম্যাক্সে এসে নিজের গোপন আস্তানা ফাঁস করে দেওয়াই নিয়ম!
জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, মাদক সেবনের পর অনলাইন জুয়া নিয়ে তর্ক হতে হতে সম্পর্ক এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যে কথার বিনিময়ে জীবন চলে যায়। পরিত্যক্ত ভবনে ডেকে নিয়ে ইট দিয়ে মাথায় আঘাত—অপরাধের ‘পরিকল্পনা’ এতটাই গোছানো ছিল যে মুক্তিপণ দাবি করতেও তারা ভুল করেনি। পুরোনো একটি সিমকার্ড সচল করে মৃত তরুণের বাবার কাছ থেকে চেয়েছিল ৪০ হাজার টাকা।
মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ বৃত্ত—বন্ধুত্ব—কখন যে ভেঙে যায়, আর সেই ভাঙনে কি বেরিয়ে আসে, সিদ্ধিরগঞ্জের এই ঘটনা তা নতুন করে মনে করিয়ে দিল।
মাদক, জুয়া আর অন্ধ আবেগ শুধু জীবনই কেড়ে নেয় না—মানুষের ভেতরের মানবিকতাও কীভাবে নিঃশেষ করে দেয়, এই ঘটনা তার নির্মমতম উদাহরণ।









Discussion about this post