নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সাংবাদিক সমাজে এক অস্বস্তিকর নাম—মীর আব্দুল আলীম।
একসময়ের সাধারণ গার্মেন্ট শ্রমিক থেকে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে নিজের পরিচয়কে এমনভাবে বিস্তার করেছেন যে এখন তাকে ঘিরে রয়েছে বিতর্ক, প্রশ্ন, ক্ষোভ ও অভিযোগের পাহাড়।
অভিযোগ—জাল সনদ, সাংবাদিকতার আড়ালে ব্ল্যাকমেইল, প্রভাবশালী মহলকে ব্যবহার, সাংবাদিকদের ওপর হামলা-মামলার চাপ, অবৈধ সম্পদ গড়া—এমনকি এসব অভিযোগে দুদকও তদন্তে নেমেছে।
সাংবাদিকতার মুখোশ পরে ‘ক্ষমতার বাণিজ্য’
সূত্র বলছে—আলীম প্রথমে গার্মেন্ট শ্রমিক ছিলেন। পরে নানা রাজনৈতিক-সাংবাদিক মহলের ‘আশীর্বাদ’ নিয়ে নিজেকে কখনো কলামিস্ট, কখনো গবেষক, কখনো শিল্পপতি, কখনো আবার লায়ন সংগঠনের নেতা দাবি করতে থাকেন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এইসব পরিচয় তিনি পেলেন কীভাবে ?
অভিযোগকারীরা বলছেন—টাকার বিনিময়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্যপদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মাধ্যমে তিনি শুরু করেন ‘সাংবাদিকতার নামে ক্ষমতার বাণিজ্য’।
চাঁদাবাজি ও ভয় দেখানোর অভিযোগ
রূপগঞ্জের বহু সাংবাদিক অভিযোগ করেছেন—আলীম তার সাথে তোলা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ছবি ব্যবহার করে ভয়ভীতি দেখাতেন।
“আমার কথা না শুনলে হামলা-মামলায় জড়িয়ে দেব”— এমন হুমকি ছিল নিয়মিত।
কারও বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করতে হলে হতো তার অনুমতি; না হলে শুরু হতো চাপ, তদ্বির, অপমান, এমনকি মিথ্যা মামলার ভয়।
সত্য সংবাদ প্রকাশেই শত্রুতা
২০২০ সালে রূপগঞ্জ প্রেস ক্লাবের কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক তার কথার বাইরে গিয়ে সত্য তথ্য প্রকাশ করায় হঠাৎ করেই তাদের বিরুদ্ধে ‘চাঁদাবাজি’ অভিযোগ তুলে বহিষ্কৃত করা হয়।
পরে ইমদাদুল হক দুলালের বাসায় হামলার অভিযোগ ওঠে—যেখানে সাংবাদিকের স্ত্রী-সন্তান পর্যন্ত আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।
সাংবাদিক সমাজ অভিযোগ করে—প্রেস ক্লাবকে নিজের ব্যক্তিগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতেন আলীম।
সম্পদের পাহাড়: অভিযোগে যে তালিকা উঠে এসেছে
দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে যে সম্পদের তালিকা রয়েছে, তা সাধারণ কোনো উপজেলা-স্তরের রিপোর্টার তো দূরের কথা—মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরও কল্পনা করা কঠিন।
অভিযোগে উল্লেখ আছে—
পূর্বাচলে ৩ কাঠার মূল্যবান প্লট
আল–রাফি হাসপাতালের চেয়ারম্যান পদ
লাইফ এইড হাসপাতাল (ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে)
তার মায়ের নামে ৩০টি কার্গো জাহাজ
৪টি মাটি কাটার ভেকু
অবৈধ ইটভাটা
বনশ্রীতে ৯০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট
রূপগঞ্জে দুটি অবৈধ জেটি
বিভিন্ন মার্কেটে দোকান
সরকারি জমি দখলের অভিযোগ
সাগরকন্যা নেভিগেশন, অ্যারাবিয়ান ট্রাভেলসসহ একগুচ্ছ প্রতিষ্ঠান
কোটি টাকার বাল্কহেডে অংশীদারিত্ব
অভিযোগকারীদের ভাষায়—“একজন সাধারণ শ্রমিক কি করে কয়েক বছরের ব্যবধানে এতসব সম্পদের মালিক হলো ?”
সাংবাদিকতার বস্তুনিষ্ঠতা ধ্বংসের প্রতীক
রূপগঞ্জের প্রবীণ সাংবাদিকদের বক্তব্য—আলীমের মতো বিতর্কিত ব্যক্তিরা সাংবাদিকতা পেশার সুনাম নষ্ট করছে।
“প্রেস ক্লাব যেন তার ব্যক্তিগত ফার্মহাউজ—এমন আচরণ করতেন তিনি।”
এই অস্বাভাবিক উত্থান, ক্ষমতার জবরদখল, এবং সাংবাদিকদের হয়রানির অভিযোগ পুরো পেশাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
দুদকের তদন্ত ও সাংবাদিক মহলের প্রত্যাশা
দুদক তদন্ত শুরু করেছে—কোনো সম্পদ বৈধ, কোনটি অবৈধ, ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে কি না—সব কিছুই এখন তদন্তের টেবিলে।
সাংবাদিক মহলের প্রত্যাশা—“সত্য উদঘাটিত হোক এবং সাংবাদিকতার নামে ‘মাফিয়াতন্ত্র’ যেন আর প্রতিষ্ঠিত না হয়।”








Discussion about this post