নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণের সেবা নিশ্চিত করা—কিন্তু বাস্তবে একশ্রেণির কর্মকর্তা–কর্মচারী সেই সেবাকেই বানিয়েছেন ‘দামি পণ্য’। ফাইল নড়াতে লাগবে চাঁদা, দ্রুত সেবা পেতে হবে উপরি, আর কোনো কোনো কর্মকর্তা তো এটাকে বৈধ কর্মসংস্কৃতি হিসেবেই প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন। পাঁচ আগস্টের পর মানুষ আশা করেছিল হয়রানির এই যুগ শেষ হবে—কিন্তু প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা বলে, জুলাই বিপ্লব শুধু ক্যালেন্ডারে এসেছে, অফিস সংস্কৃতিতে নয়।
টিআইবির সাম্প্রতিক গবেষণা জানায়—বাংলাদেশে অন্তত পাঁচটি মূল সেবা নিতে গিয়ে নিয়মিত চাঁদা গুনতে হয়: থানায় অভিযোগ নেওয়া, ভূমি অফিসে ফাইল নড়া, বিআরটিএর লাইসেন্স–রেজিস্ট্রেশন, আদালতে আইনি সহায়তা এবং হাসপাতালে স্বাস্থ্যসেবা। এ ছাড়া পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধন, নাগরিক পরিচয়পত্রসহ আরও অসংখ্য সেবায় অতিরিক্ত অর্থ যেন অঘোষিত ‘সরকারি নিয়ম’।
থানা : বিচার নয়, দর-কষাকষির আড্ডা
থানায় সাহায্য চাইতে গেলে ভুক্তভোগীই হয়ে যান আসামি—এমন অভিযোগ এখন প্রকাশ্য। চাঁদাবাজ চক্রের ধাওয়া খেয়ে থানায় যাওয়া এক ব্যক্তি জানান, পুলিশ উল্টো তাকে পরামর্শ দিয়েছে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে ‘ঝামেলা মিটিয়ে নিতে’। এসআই পর্যায়ের কর্মকর্তা পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলেন, “এটা দিয়ে মিটিয়ে ফেলেন, আর ঝামেলা বাড়াবেন না।”
পরবর্তীতে জানা যায়—পুলিশ ও চাঁদাবাজদের গোপন আঁতাত বহুল প্রচলিত। মামলা বাণিজ্য, গণ মামলার ভয় দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের থেকে অর্থ আদায়—এসব যেন এখন ‘অভ্যাস’।
যাত্রাবাড়ীর এক ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা আরও ভয়ঙ্কর। চাঁদা না দিলে ‘আগস্ট হত্যা মামলা’র আসামি বানিয়ে দেওয়ার হুমকি। এক সপ্তাহের মধ্যে সত্যি একটি হত্যা মামলায় তার নাম ঢুকে গেল থানা তালিকায়। বাকিটা তিনি আর বলতে চান না—দেশে থাকতে হলে চাঁদা দিয়ে থাকাই নিরাপদ, এটুকুই শুধু বললেন।
ভূমি অফিস : পদায়নের ঘুষ উঠায় চাঁদার হার বাড়তি
ভূমি অফিসে চাঁদাবাজি যেন নিত্যদিনের রীতি। সাব রেজিস্ট্রার পদায়নে ঘুষের হার বাড়ায় সেবাগ্রহীতাদের ওপর চাপ বেড়েছে কয়েকগুণ। জেলা প্রশাসকের পদায়নেও পুরোনো ঘুষ–বাণিজ্য ফের জেগে উঠেছে। তাই ভূমির ফাইল চাইলে এখন ‘রেট’ আগের দ্বিগুণ।
অন্যান্য সেবা : আগের নিয়মেই—চাঁদা ছাড়া কিছুই নড়ে না
গ্যাস সংযোগ, টেন্ডার, নাগরিক সনদ—সব জায়গায় একই গল্প। এক ব্যবসায়ী ব্যঙ্গ করে বলেন, “আগে একজনকে দিলেই হতো, এখন ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়। যেন সরকারি সেবা নয়, টোল রোড।”
জুলাই বিপ্লবেও টিকে থাকা ‘অদৃশ্য ক্ষমতা’
ভুক্তভোগীরা বলছেন—সরকারের ভেতরেই আছে ঘাঁটি গেড়ে থাকা চাঁদাবাজ চক্র। দল–দলাল বদল করলেও তাদের অবস্থান অটল। নতুন ক্ষমতার কাঠামোয় তারা আরও প্রভাবশালী হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এদের রুখবে কে? জনগণ না সরকার—নাকি কেউই নয় ?
সেবার নামে চাঁদাবাজি চলতেই থাকলে জুলাই বিপ্লব শুধু স্লোগানেই থাকবে; আর নাগরিক সেবা হবে ‘দাম দিয়ে কেনা পণ্য’—যেখানে ন্যায়, অধিকার, সমান সুযোগ সবই বন্দি কিছু কর্মকর্তার লোভী ড্রয়ারে।









Discussion about this post