স্টাফ রিপোর্টার
ঢাকা, ৯ ডিসেম্বর ২০২৫
নারায়ণগঞ্জ, আড়াইহাজার ও সোনারগাঁও অঞ্চলে দিনের পর দিন অবাধে ফুলে–ফেঁপে ওঠা অবৈধ গ্যাস–বাণিজ্যের বিরুদ্ধে অবশেষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিসন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি। মঙ্গলবার দিনব্যাপী পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে শত শত অবৈধ আবাসিক–বাণিজ্যিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন, পাইপলাইন জব্দ ও বকেয়া অর্থ আদায়ের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই স্থানীয় মহলে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে—কারণ সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এই অবৈধ সংযোগগুলো রাতারাতি জন্মায়নি; তিতাসেরই কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পৃষ্ঠপোষকতায় বহুদিন ধরে চালু ছিল এই ‘গ্যাস কারসাজির সাম্রাজ্য’।
১৯০ বাড়িতে ২৪০টি অবৈধ চুলা সংযোগ বিচ্ছিন্ন
রূপগঞ্জ–আড়াইহাজার অঞ্চলের মানেহরদি, কালিবাড়ি ও বিনাইরচরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শামিমা আফরোজ মারলেসের নেতৃত্বে অভিযানে বেরিয়ে আসে উদ্বেগজনক তথ্য।
– ১৯০টি বাড়িতে ২৪০টি অবৈধ ডাবল চুলার সংযোগ
– বিভিন্ন ব্যাসের ৪৪০ ফুট পাইপলাইন জব্দ
– ৫ গ্রাহকের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক বকেয়া ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা আদায়
এমন দৃশ্যপট দেখেই স্থানীয়দের ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের অভিযোগ—অর্থের বিনিময়ে তিতাসের কিছু কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে অবৈধ সংযোগকে ‘নিরাপত্তা চাঁদা’র মতো সুরক্ষা দিয়ে এসেছে।
চুনা কারখানায় বড় ধরনের গ্যাস অপচয়
সোনারগাঁওয়ের পিরোজপুর, আষাঢ়িয়ার চর ও প্রতাপেরচরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ তৌফিকুর রহমানের অভিযানেও মিলেছে ভয়াবহ চিত্র। চারটি চুনা কারখানার সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে প্রতিদিন প্রায় ২ লাখ ৩ হাজার টাকার গ্যাস অপচয় রোধ হয়েছে।
প্রশ্ন উঠছে—এত বড় আকারের শিল্প–সংযোগ কি অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছিল, আর কর্তৃপক্ষ এতদিন কিছুই দেখেনি?
জনগণের ক্ষোভ: “তিতাসের ভেতরেই বড় সিন্ডিকেট”
অভিযান শেষে এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল স্পষ্ট ও কঠোর—
সংযোগ দিতে এককালীন মোটা অঙ্ক নেওয়া
মাসিক ভিত্তিতে অবৈধ অর্থ লেনদেন
অভিযোগ দিলেও বছরের পর বছর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়া
বাসিন্দারা প্রশ্ন তুলেছেন,
“যদি তিতাসের ভেতরেই অসাধুচক্র না থাকত, তাহলে এত বিপুলসংখ্যক অবৈধ সংযোগ কীভাবে টিকে থাকে?”
অভিযান ‘নিয়মিত হবে’, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেল
তিতাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—অবৈধ সংযোগ দমনে অভিযান চলমান থাকবে।
তবে সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, অভিযান যখন শেষ হয়, তখন কি সেই অসাধু কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ তদন্তও শুরু হয়? নাকি গ্যাস চোরদের হাত ধরা হয়, আর যারা বছরের পর বছর তাদের সুরক্ষা দিয়েছে—তাদের ছোঁয়া হয় না?
অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির বিচার ছাড়া সমাধান অসম্ভব
এই অঞ্চলে ‘গ্যাস চুরি’ এখন আর শুধু চুরির ঘটনা নয়—এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ফল। যতদিন তিতাসের ভেতরের অসাধু কর্মচারী–কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হবে, ততদিন অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলো বলেই এই সিন্ডিকেট ভেঙে যাবে—এটা ভাবা নিছক কল্পনা।
জনগণের দাবি স্পষ্ট
১. তিতাসের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিবাজদের শাস্তি
২. টেকসই মনিটরিং সিস্টেম চালু
৩. অভিযানের প্রকৃত ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ
৪. অবৈধ সংযোগ রোধে স্থানীয় পর্যায়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা
উচ্ছেদ অভিযান অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু প্রকৃত সংস্কার হবে তখনই, যখন তিতাসের ভেতরের অসাধু সিন্ডিকেট ভেঙে আইনগত শাস্তি নিশ্চিত করা হবে—কারণ এই গ্যাস দুর্নীতি শুধু সরকারি রাজস্বকেই নয়, বরং সাধারণ মানুষকেও বছরের পর বছর বিপদে ফেলছে।









Discussion about this post