নিজস্ব প্রতিবেদক :
গত ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্পে নারায়ণগঞ্জে অন্তত ১৮টি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন শনাক্ত করেছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং জেলা প্রশাসন। এসব ভবনের কোথাও দেয়াল ও বিমে ফাটল, কোথাও পিলারে ক্ষতচিহ্ন, আবার কোথাও পুরো ভবনই হেলে পড়েছে। ফলে ভবনগুলোকে আপাত-ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে বাসিন্দাদের দ্রুত সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে বেশির ভাগ পরিবার ভবন ত্যাগ করলেও কিছু মালিক এখনও অবস্থান করছেন পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায়।
দ্রুত নগরায়নে কাঠামোগত ঝুঁকির আশঙ্কা
দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় গড়ে উঠছে একের পর এক বহুতল ভবন। তবে নির্মাণের মান, সয়েল টেস্ট এবং প্রকৌশলগত নিয়মকানুন কতটা মানা হচ্ছে—সে প্রশ্ন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের পর।
নারায়ণগঞ্জ ডেভেলপার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতা গোলাম সারোয়ার সাঈদ মনে করেন, ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বড় দায় মালিকের। তিনি বলেন, “সঠিকভাবে সয়েল টেস্ট না করা হলে ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। মালিকরা এসব বিষয়ে সচেতন না হলে বিপদ এড়ানো সম্ভব নয়।”
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা—সিদ্ধিরগঞ্জ
রাজউকের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৮টি ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার মধ্যে বেশির ভাগই সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিং ও তার আশপাশে। প্রকৌশলীদের ভাষ্য মতে, এই অঞ্চলের মাটি তুলনামূলক নরম হওয়ায় ভূমিকম্পে ভবনগুলো বেশি প্রভাবিত হতে পারে। পাশাপাশি বহু ভবনেই নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় সয়েল টেস্ট না করার প্রবণতা বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
চিহ্নিত কিছু ক্ষতিগ্রস্ত ভবন
ফতুল্লা : পাগলা বাজারের হাজী ইউনুস সুপার মার্কেট, হাজী মিছির আলী মার্কেট, আলীগঞ্জের দুটি চারতলা ভবন
মিশনপাড়া : নয়তলা এস আহমেদ প্যালেস
মাসদাইর : দুটি পাঁচতলা হেলে পড়া ভবন
সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিং :
২ নম্বর রোড – দুইটি পাঁচতলা ভবন
৪ নম্বর রোড – পাঁচতলা ও সাততলা ভবন
৫ নম্বর রোড – দুইটি পাঁচতলা ভবন
হীরাঝিল, মিজমিজি, আদমজীনগর—ছাদের প্যারাপেট ভেঙে পড়া, দেয়ালে ফাটল ও হেলে পড়া ভবন
বাসিন্দাদের নিরাপত্তাহীনতা ও অপেক্ষারত সিদ্ধান্ত
সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিংয়ের কয়েকটি ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পরিবারই নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় নতুন বাসায় সরে গেছেন। একটি ভবনের মালিকের ছেলে নাহিয়ান বলেন,
“রাজউক বুয়েটের পরীক্ষা করতে বলেছে। ফি জমা দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষা বললে আমরা পুরো ভবন খালি করে দেব।”
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করেন, বুয়েটের চূড়ান্ত পরীক্ষা ছাড়া এসব ভবনে বসবাস করা নিরাপদ নয়।
রাজউক ও প্রশাসনের অবস্থান
রাজউকের অথরাইজড অফিসার রঙ্গন মণ্ডল জানান,
“১৮টি ভবন সাময়িকভাবে খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেউ সেটি না মানলে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে জানানো হবে।”
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবীর বলেন,
“পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে। বাসিন্দাদের নিরাপত্তাই আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।”
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
প্রকৌশলীরা মনে করছেন—
১. সিদ্ধিরগঞ্জ অঞ্চলের মাটির ধরন নিয়ে বিস্তারিত জিও-টেকনিক্যাল সমীক্ষা জরুরি।
২. সব বহুতল ভবন নির্মাণে বাধ্যতামূলক সয়েল টেস্ট পুনরায় কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
৩. ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ক্ষেত্রে স্থায়ী ব্যবহারযোগ্যতা (Structural Integrity Assessment) জরুরি।
উপসংহার
সাম্প্রতিক ভূমিকম্প নারায়ণগঞ্জের দ্রুত নগরায়নের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাগুলোকে স্পষ্ট করে দিয়েছে। নরম মাটি, অপর্যাপ্ত সয়েল টেস্ট এবং নির্মাণজনিত ত্রুটির সমন্বয়ে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। তাই প্রকৌশলগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং দায়িত্বশীলতা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।









Discussion about this post