মহানগর প্রতিনিধি :
আওয়ামীলীগ সরকারের পতন অর্থাৎ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর নারায়ণগঞ্জ শহর ধীরে ধীরে নয়—বেপরোয়া গতিতে বসবাসের অযোগ্য নগরীতে রূপ নিতে শুরু করেছে। মাত্র দুই কিলোমিটার শহর পেরোতে যেখানে লাগে কয়েক মিনিট, সেখানে এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট নামের যন্ত্রণায় নাকাল সবাই। এর সাথে যোগ হয়েছে ধুলাবালির দমবন্ধ পরিবেশ, ট্রাফিক পুলিশের নগ্ন চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্য, হকারদের দখলদারিত্ব আর প্রতিদিন লাশ পাওয়ার বিভীষিকাময় বাস্তবতা। যেন পুরো শহরকে কেউ বোতলে বন্দী করে মেরে ফেলছে—শুধু ঘোষণা দেওয়া বাকি।
সরকার বদলেছে, ক্ষমতা পাল্টেছে, কিন্তু দুর্বৃত্তদের নিয়ন্ত্রণ পাল্টায়নি। পুলিশ সুপার জসীম উদ্দীন কঠোর নির্দেশনা দিলেন—বন্ধ হলো কিছুই না। বর্তমান পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী ‘জিরো টলারেন্স’ লাঠি উঁচিয়ে ধরলেন—অপরাধীরা হাসল। আর আজকের দিনের মতো রোগীবাহী গাড়িও ছাড় পেল না ট্রাফিক পুলিশের হাত থেকে। মরণাপন্ন মানুষ, কিন্তু পুলিশ সদস্যদের কাছে তারাও শুধু ‘টাকা তোলা’র আরেকটি চলমান মেশিন।
হকার সন্ত্রাস: শহরকে গিলে খাচ্ছে নতুন দখলদাররা
বিবি রোড আজ হকারদের রাজ্য। ফুটপাত—শেষ। সড়ক—শেষ। পথচারীর পথ—শেষ। আর মানুষের ধৈর্যও—শেষ।
৫ আগস্টের পর পুরো হকার নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে বিএনপি নামধারী কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে । হোসিয়ারী সমিতি মিলনায়তন এখন পরিণত হয়েছে ‘হকার-শাসন আদালতে’। সেখানে কথার বিচার হয় না—হয় মারধরের বিচার।
হকারদের নিজেরাও বলেন—
সকালে ১০০ টাকা,
বিকেলে ৩০০ টাকা চাঁদা,
জেনারেটর লাইনের জন্য বাড়তি টাকা,
আর সমস্যা হলে নেতার কাছে হাজিরা।
অর্থাৎ, নারায়ণগঞ্জ শহরের বুকে নতুন করে জন্ম নিয়েছে একটি ‘মিনি মাফিয়া ইকোনমি’। যার নিয়ন্ত্রকরা রাজনৈতিক পরিচয়ে ভারী, কাজে ভারী অরাজক।
অবৈধ স্ট্যান্ড : শহরের গলায় পাথর বেঁধে ডুবিয়ে মারার অস্ত্র
চাষাঢ়া গোলচত্বর—শহরের হৃদপিণ্ড। কিন্তু সেই পিণ্ডটাই এখন অবৈধ স্ট্যান্ডের অ্যাটকে রক্তহীন।
খাজা সুপার মার্কেটের সামনে—অবৈধ লেগুনা স্ট্যান্ড
সুগন্ধা বেকারীর সামনে—শিমরাইলগামী স্ট্যান্ড
সোনালী ব্যাংকের সামনে—অবৈধ সিএনজি
রাইফেল ক্লাবের পাশে—সাইনবোর্ডগামী লেগুনা
সরকারি মহিলা কলেজের সামনে—ফতুল্লাগামী বেবিট্যাক্সি
কালীরবাজার—অবৈধ টেম্পু
এ যেন শহরের প্রতিটি ইঞ্চিকে ‘স্ট্যান্ড’ বানিয়ে দেওয়ার মহোৎসব।
মৌমিতা ট্রান্সপোর্ট তো সরাসরি শহীদ মিনারের পাশেই বানিয়ে ফেলেছে মিনি বাসস্ট্যান্ড। শহীদ মিনারের চেয়ে তাদের ব্যবসা যেন বেশি সম্মানযোগ্য হয়ে উঠেছে।
নগরীর প্রশ্ন : এই শহরকে মারছে কারা ?
শহরবাসীর প্রশ্ন—
এই হত্যাকারীরা কারা?
কে নারায়ণগঞ্জকে গলাটিপে হত্যা করছে ?
কারণ এ শহরের অরাজকতার পেছনে এখন কোনো গোপন শক্তি নেই—সবই প্রকাশ্য।
হকারদের নিয়ন্ত্রকরা প্রকাশ্য।
স্ট্যান্ড দখলদাররা প্রকাশ্য।
সন্ত্রাসের কারখানা প্রকাশ্য।
চাঁদাবাজি প্রকাশ্য।
শুধু প্রশাসনের ‘দেখার চোখটাই’ অদৃশ্য।
মজার ব্যাপার হলো—যারা শহরকে রক্ষা করার কথা, তারাই প্রতিদিন শহরকে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করছে। আর যারা শহরের ভবিষ্যতের কথা বলে, তারাই আবার সেই দখলদারদের কাঁধে হাত রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যেন অজগর সাপকে বুকে জড়িয়ে রেখে বলছেন—“সব ঠিক হয়ে যাবে!”
নারায়ণগঞ্জ এখন এক ভৌতিক বাস্তবতা
নারায়ণগঞ্জ শহর আজ—
ধুলোয় শ্বাসরুদ্ধ,
চাঁদাবাজিতে জর্জরিত,
অবৈধ দখলে বিপর্যস্ত,
ট্রাফিক সন্ত্রাসে ক্লান্ত,
আর লাশের খবরের শহর।
এ শহরকে বাঁচাতে হলে প্রথমে শহরকে ‘খাচ্ছে’ এমন গোষ্ঠীগুলোর ছুরিই আটকাতে হবে।
না হলে নারায়ণগঞ্জ আর শহর থাকবে না—
থাকবে কেবল একটি মৃত নগরের মৃত্যু-সনদ।









Discussion about this post