নিজস্ব প্রতিবেদক :
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের চারটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। তবে প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই দলটির অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ, প্রকাশ্য বিদ্রোহ এবং পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা বেশিরভাগ আসনেই ঘোষিত প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন, করেছেন কাফন পড়ে মিছিল সমাবেশ, ফলে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা গড়ে ওঠার বদলে বাড়ছে বিভাজন ও অনাস্থা।
চার আসনেই বিরোধিতা, ঐক্যের ডাকেও সাড়া নেই
৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের ২৩৭টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেন। নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের মধ্যে ১, ২, ৩ ও ৫– নম্বরে প্রার্থী দেওয়া হলেও প্রায় সবকটিতেই বিদ্রোহ ও অসন্তোষ তীব্রভাবে প্রকাশ পেয়েছে। দলীয় প্রার্থীদের আহ্বানের পরও মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের মধ্যে ঐক্যের ইঙ্গিত নেই, বরং কেউ কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ারও প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নারায়ণগঞ্জ-৫: ‘বহিরাগত’ অভিযোগে তুমুল ক্ষোভ
সদর ও বন্দর এলাকা নিয়ে গঠিত এ আসনে যুবদল–ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী মাসুদুজ্জামান মাসুদকে প্রার্থী করায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতা।
তারা দাবি করছেন—মাসুদ ‘আকস্মিকভাবে’ এসে মনোনয়ন পেয়েছেন। সাবেক এমপি আবুল কালামসহ বঞ্চিত নেতারা প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে প্রচারে নেমেছেন এবং মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানাচ্ছেন।
মাসুদুজ্জামান অবশ্য আশা করছেন—“দিনশেষে সবাই দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে মাঠে নামবেন।” তার পক্ষে সাবেক বহিষ্কৃত কয়েকজন নেতাকে আবার দলে ফিরিয়েও নেওয়া হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩: সীমানা পরিবর্তনে জটিলতা, ৭ নেতার একজোট বিদ্রোহ
সোনারগাঁ এবং সিদ্ধিরগঞ্জের নতুন সীমানা মিলিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে আজহারুল ইসলাম মান্নানকে। কিন্তু মনোনয়ন পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন বঞ্চিত সাত নেতা।
তারা লিখিত অভিযোগ পাঠিয়ে প্রার্থীর ‘শিক্ষাগত যোগ্যতা’ থেকে ‘জয়ের সম্ভাবনা’—সবকিছু নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
মান্নান এটিকে “ষড়যন্ত্র” হিসেবে উল্লেখ করে বলছেন—তৃণমূল তার পক্ষে রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২: পথে নেমে বঞ্চিত নেতাদের প্রতিবাদ
আড়াইহাজারকে কেন্দ্র করে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে প্রার্থী হয়েছেন কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ। কিন্তু সাবেক এমপি আতাউর রহমান আঙ্গুর, কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুর রহমান এবং পারভীন আক্তারসহ বঞ্চিত নেতারা তার মনোনয়ন প্রত্যাহারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন।
এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তারা বলছেন—“এ প্রার্থীকে রেখে নির্বাচন জেতা অসম্ভব।”
আজাদ অবশ্য দাবি করছেন—“দলের স্বার্থে সবাই এক সময়ে এক হয়ে যাবেন।”
নারায়ণগঞ্জ-১: দিপুর মনোনয়নে ‘দুই বলয়ের’ সংঘাত
রূপগঞ্জে বিএনপি প্রার্থী হয়েছেন ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। কিন্তু এখানে মূল বিভাজন তৈরি হয়েছে মনিরুজ্জামান মনিরের অনুসারীদের সঙ্গে দিপুর সমর্থকদের দ্বন্দ্বকে ঘিরে।
সংঘর্ষের ইতিহাস থাকা এ দুই বলয়ের বিরোধ এখনও প্রশমিত হয়নি। মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে ঢাকা–সিলেট মহাসড়কেও মিছিল হয়েছে।
দিপুর দাবি—“রূপগঞ্জবাসী আমার সঙ্গে আছে, দলের সবাই মিলেই কাজ করব।”
নারায়ণগঞ্জ-৪: এখনও প্রার্থী নেই, তবুও তীব্র প্রতিযোগিতা
ফতুল্লা ও সদর উপজেলার অংশ নিয়ে গঠিত নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে বিএনপি এখনো প্রার্থী দেয়নি। তবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা তুঙ্গে—মোহাম্মদ আলী, শাহ আলম, মাশুকুল ইসলাম রাজীবসহ অন্তত ছয়জন কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণে প্রচারে ব্যস্ত।
এ আসনটি গতবার শরিক জোটকে ছাড়লেও এবার দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তৃণমূল অস্থির
তৃণমূল নেতারা বলছেন, মনোনয়ন ঘিরে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পাল্টা-বিবৃতি, রাস্তায় মিছিল এবং প্রকাশ্য অনাস্থা—এসব পরিস্থিতি দলের জন্য বড় সংকট তৈরি করছে।
এ অস্থিরতা থেকে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।









Discussion about this post