মহানগর প্রতিবেদক :
প্রচলিত প্রবাদ ‘বেড়ায় ক্ষেত খায়’ যেন হুবহু বাস্তবায়িত হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা ও উন্নয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি দপ্তর কীভাবে কয়েকজন লম্পট, স্বার্থলোভী ও অসাধু কর্মচারীর হাতে দুর্নীতির আতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে—তারই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সওজ কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি শক্তিশালী অসাধু সিন্ডিকেট সক্রিয়। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী টেন্ডারের গোপন তথ্য ফাঁস, ঠিকাদারদের নিম্নমানের কাজের বৈধতা দেওয়া, সরকারি কলোনির বাসা ও রুম অবৈধভাবে দখল ও ভাড়া আদায়সহ নানাবিধ অনিয়মে লিপ্ত। এসব অপকর্মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লোপাট হলেও কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে তারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
টেন্ডার লুটপাট ও ঠিকাদার সিন্ডিকেট
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সওজের আওতাধীন বিভিন্ন উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পে টেন্ডারের আগেই নির্দিষ্ট ঠিকাদার গোষ্ঠীকে গোপন তথ্য সরবরাহ করা হয়। ফলে প্রতিযোগিতাহীনভাবে বারবার একই সিন্ডিকেট কাজ পেয়ে যাচ্ছে। ই-টেন্ডার চালুর পরও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি; বরং প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই দুর্নীতির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে।
জামায়েত উল্লাহ : অফিস সহকারীর অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়
অনুসন্ধানে উঠে আসে, মো. জামায়েত উল্লাহ নামে একজন অফিস সহকারী গত ২৫–৩০ বছর ধরে সওজ নারায়ণগঞ্জের হিসাব শাখায় থেকে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি কলোনির একাধিক বাসা ও রুম অবৈধভাবে দখল করে ভাড়া আদায় করছেন। এমনকি অবসরে যাওয়া কর্মচারীর বাসাও জবরদখল করে নিজের আয় হিসেবে ব্যবহার করেছেন। সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলেছেন, এই জামায়েত উল্লাহ হচ্ছেন দূর্ণীতির মহাজাদুকর। তার চিন্তার বাইরে কেউ দূর্ণীতিই করতে পারে না। বড় কর্তা থেকে শুরু করে ওমেদার পর্যন্ত সকলের দূর্ণীতি যেন নখদর্পনে ।
আরও অভিযোগ, নিজের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি বাসা তিনি মাস্টার রোলের এক কর্মচারীর কাছে বিপুল অঙ্কের টাকায় বিক্রি করেছেন, যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এসব অনিয়মে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নীরব সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে। একজন অফিস সহকারীর অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে জমি ক্রয় ও সন্তানের বিদেশে পড়াশোনার ব্যয় মেটানো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তোলে—এই অর্থের উৎস কোথায় ?
আনিস : ই-টেন্ডারের অন্ধকার কারিগর
আনিস নামে এক কম্পিউটার অপারেটারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ই-টেন্ডার কার্যক্রম কার্যত তার নিয়ন্ত্রণেই ছিল। তিনি টেন্ডারের গোপন তথ্য নির্দিষ্ট ঠিকাদার সিন্ডিকেটকে সরবরাহ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বারবার একই গোষ্ঠী টেন্ডার পেয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তিনি শ্রমিক-কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকিও দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সোহাগ : মাঠপর্যায়ের দুর্নীতির নীরব নিয়ন্ত্রক
কার্যসহকারী সোহাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের বিভিন্ন প্রকল্পের মাঠপর্যায়ে নিম্নমানের কাজকে নিয়মিত বৈধতা দিয়ে আসছেন তিনি। ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে এভাবে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ। তার ভূমিকা ছাড়া মাঠপর্যায়ের দুর্নীতি এত বিস্তৃত হতো না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভয়ংকর সিন্ডিকেট ও প্রশাসনের নীরবতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই ঠিকাদার সিন্ডিকেটের সঙ্গে অতীতে আলোচিত অপরাধচক্রের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময় গুরুতর মামলার আসামিরাও এই সিন্ডিকেটের ছত্রছায়ায় থেকে সরকারি কাজ বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে অতীতে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি। প্রশ্ন উঠছে—এত অভিযোগ, এত অস্বাভাবিক সম্পদের পরও কেন প্রশাসনের নীরবতা? কার ছত্রছায়ায় টিকে আছে এই দুর্নীতির রাজত্ব?
দাবি ও প্রত্যাশা
সচেতন মহলের দাবি, নারায়ণগঞ্জ সওজে অবিলম্বে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। নইলে ‘উন্নয়ন’ নামের এই দুর্নীতির মহোৎসব থামবে না, আর রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের শিকার হতে থাকবে।









Discussion about this post