নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মতো একটি সংবেদনশীল ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তাকে ঘিরে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তা কেবল ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয় নয়—এটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অতীত ভূমিকা, রাজনৈতিক ক্ষমতার ছায়া এবং বর্তমান সময়ে ‘আইনের শাসন’ কতটা কার্যকর, সেই মৌলিক প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রবিবার (১৪ ডিসেম্বর) দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের মূল ফটকের নিচে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মঞ্জুর কাদেরকে শনাক্ত করার পর জামায়াত সমর্থিত আইনজীবী ও সাবেক ইসলামী ছাত্রশিবির নেতাদের তোপের মুখে পড়ার ঘটনা একদিকে যেমন অতীতের দমন–নিপীড়নের স্মৃতিকে উসকে দিয়েছে, অন্যদিকে তেমনই প্রকাশ করেছে প্রশাসনিক নীরবতা ও রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব।
অতীতের অভিযোগ: নিপীড়নের ধারাবাহিক বর্ণনা
অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট তাওফিকুল ইসলামের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৩ সালে রাজনৈতিক আন্দোলনের সময় তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক মঞ্জুর কাদেরের নেতৃত্বে তাদের গ্রেপ্তার, শারীরিক নির্যাতন, গুম ও অর্থ আদায়ের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। এসব অভিযোগ নতুন নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মী ও আইনজীবীদের মুখে শোনা যায় এমন অভিযোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো—এই অভিযোগগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়কালের রাষ্ট্রীয় দমননীতির প্রতিফলন, যেখানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় কিছু পুলিশ কর্মকর্তা কার্যত ‘দমনযন্ত্রে’ পরিণত হয়েছিলেন—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে।
রাজনৈতিক সখ্য ও স্বার্থসংযোগের অভিযোগ
স্থানীয় সূত্রে উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, মঞ্জুর কাদের নারায়ণগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং শীতল ট্রান্সপোর্ট লিমিটেডে অংশীদারিত্বের কথাও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা নিশ্চিত তথ্য নেই, তবুও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একজন কর্মকর্তার সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের এমন সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি করে।
প্রশাসনের নীরবতা : দায় এড়ানোর চেষ্টা ?
ঘটনার পর জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) “কোনো খবর পাইনি” বক্তব্যটি পরিস্থিতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে, প্রকাশ্যে আইনজীবী ও রাজনৈতিক নেতাদের উপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনাকে ‘অজানা’ বলা প্রশাসনিক দায়িত্বশীলতার ঘাটতিকেই নির্দেশ করে।
এটি কি সত্যিই তথ্যের অভাব, নাকি বিতর্কিত অতীতের একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানোর কৌশল—সে প্রশ্নও উঠছে।
মব জাস্টিস বনাম বিচারহীনতার বাস্তবতা
বিএনপিপন্থী সিনিয়র আইনজীবীরা মঞ্জুর কাদেরকে উদ্ধার করে নেওয়ার যুক্তি হিসেবে ‘মব জাস্টিস প্রতিরোধ’-এর কথা বলেছেন। নীতিগতভাবে এটি গ্রহণযোগ্য। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন থেকে যায়—যদি অভিযোগগুলো এতটাই গুরুতর হয়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করার উদ্যোগ কোথায় ?
একদিকে মব জাস্টিস অগ্রহণযোগ্য, অন্যদিকে বছরের পর বছর অভিযোগ ঝুলে থাকা এবং অভিযুক্তদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ পাওয়াও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সামনে কী ?
সাইফুল ইসলামের মামলার ঘোষণার মধ্য দিয়ে বিষয়টি নতুন মোড় নিতে পারে। তবে বাস্তবতা হলো—এ ধরনের মামলার সুষ্ঠু তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে এটি আরেকটি ‘অভিযোগের ফাইল’ হয়েই থেকে যাবে।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জের এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—রাষ্ট্রের একটি অধ্যায়ে সংঘটিত নির্যাতনের দায় আজও অনিষ্পন্ন। রাজনৈতিক পালাবদল হলেও বিচারহীনতার সংস্কৃতি যদি বহাল থাকে, তাহলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না।
এখন সময় এসেছে, অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের বাইরে গিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত, নিরপেক্ষ বিচার এবং অতীতের ক্ষমতার অপব্যবহারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার। তা না হলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ঘটে যাওয়া এই উত্তেজনা কেবল একটি ঘটনার নাম হয়েই থাকবে—সমাধানের নয়, বরং ব্যর্থতার প্রতীক হিসেবে।









Discussion about this post