প্রধান প্রতিবেদক :
বিএনপির দলীয় শৃঙ্খলা ও নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ সেই প্রশ্নকে আরও তীব্র ও অনিবার্য করে তুলেছে। একদিকে ফতুল্লা থানা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরী—অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদ। অভিযোগের ধরন, প্রকাশ্যতা ও প্রমাণের শক্তি বিবেচনায় এই দুই ঘটনায় দলীয় সিদ্ধান্তের ফারাক বিএনপির ভেতর-বাইরে ‘দ্বিমুখী মানদণ্ড’-এর অভিযোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে।
ঘটনা এক: দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা
১৫ মে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়—একজন ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে রিয়াদ মোহাম্মদ চৌধুরীকে প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব পর্যায়ের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তিনি গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যান।
এখানে তিনটি বিষয় স্পষ্ট:
(১) অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়েছে দ্রুত,
(২) দলীয় সিদ্ধান্ত প্রকাশ্য ও লিখিত,
(৩) আইনি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থা সমান্তরালে চলেছে। দলীয় শৃঙ্খলার দৃষ্টিতে এটি একটি ইতিবাচক নজির।
ঘটনা দুই:
ভাইরাল প্রমাণ, তবু নীরবতা এর বিপরীতে ১৪ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের কণ্ঠে নিজ দলের নেতা আবু হানিফ রাসেল ভূঁইয়াকে ‘হাত-পা ভেঙে এলাকা ছাড়া’ করার হুমকি—নগ্ন গালিগালাজসহ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়। এটি কোনো ব্যক্তিগত অভিযোগ নয়; বরং অডিও রেকর্ডিংয়ের মতো দৃশ্যমান প্রমাণসমৃদ্ধ ঘটনা। রাজনীতিতে হুমকি নিজেই অপরাধের ইঙ্গিত বহন করে, আর তা যখন দলীয় সহকর্মীর বিরুদ্ধে, তখন তা সরাসরি সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের শামিল। তবুও এতদিন পেরিয়ে গেলেও দলীয় কোনো তদন্ত কমিটি, কারণ দর্শানোর নোটিশ বা শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত প্রকাশ পায়নি।
প্রমাণের ভার ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি
রাজনীতিতে অভিযোগের গুরুত্ব নির্ধারণে প্রমাণের ভূমিকা মৌলিক। রিয়াদ চৌধুরীর ঘটনায় যেমন অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, নজরুল ইসলাম আজাদের ক্ষেত্রে প্রমাণ আরও শক্ত—কারণ তা জনসমক্ষে, যাচাইযোগ্য ও অস্বীকার করা কঠিন। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে: প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে কি রাজনৈতিক প্রভাব, মনোনয়ন বাস্তবতা নাকি ভিন্ন কোনো বিবেচনা কাজ করছে? দলীয় নেতৃত্বের নীরবতা এই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বরং সন্দেহকেই ঘনীভূত করছে।
দ্বিমুখী মানদণ্ডের রাজনৈতিক মূল্য
এই বৈষম্যমূলক আচরণের রাজনৈতিক মূল্য চুকাতে হয় পুরো দলকে। তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে বার্তা যায়—ক্ষমতাশালী হলে শাস্তি এড়ানো যায়। সাধারণ ভোটারের চোখে দলীয় শৃঙ্খলার দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপি যে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচারের রাজনীতির কথা বলে, বাস্তব আচরণ তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে ওঠে।
গঠনমূলক ও প্রমাণভিত্তিক করণীয়
সমালোচনার পাশাপাশি সমাধানের পথও স্পষ্ট করা জরুরি। বিএনপির উচিত—
১) নজরুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে ভাইরাল অডিওসহ সব প্রমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন;
২) তদন্তের অগ্রগতি ও সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে জানানো; ৩) হুমকি ও সহিংস ভাষাকে সাংগঠনিক অপরাধ হিসেবে লিখিতভাবে সংজ্ঞায়িত করা;
৪) পদ, প্রার্থী বা প্রভাব নির্বিশেষে একই শাস্তির মানদণ্ড প্রয়োগ;
৫) ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ।
উপসংহার :
রিয়াদ চৌধুরীর ঘটনায় বিএনপি যে দ্রুত ও দৃশ্যমান সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা দলীয় শৃঙ্খলার পক্ষে ইতিবাচক উদাহরণ। কিন্তু একই সময়ে নজরুল ইসলাম আজাদের ঘটনায় নীরবতা সেই উদাহরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। প্রমাণের মুখে নীরবতা কখনোই নিরপেক্ষতা নয়; এটি পক্ষ নেওয়ারই অন্য নাম। বিএনপি যদি সত্যিই নীতি ও আদর্শের রাজনীতি করতে চায়, তবে এই দ্বিমুখী অবস্থান থেকে বেরিয়ে এসে প্রমাণভিত্তিক, সমান ও ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্তই একমাত্র পথ।









Discussion about this post