নিজস্ব প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর গাড়ি প্রকাশ্য সড়কে অবরুদ্ধ হওয়ার ঘটনা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন করে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিকেএমইএ ভবনের সামনে ছাত্রশক্তি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ছাত্রদল, এনজিবি ও ‘ওয়ারিয়র্স অফ জুলাই’-এর নেতাকর্মীরা সড়ক অবরোধ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার গাড়ি আটকে দেন। প্রায় আধাঘণ্টা ধরে একজন দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা এভাবে অবরুদ্ধ থাকা কেবল একটি রাজনৈতিক প্রতিবাদ নয়, বরং এটি সরকারের কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক সক্ষমতার দুর্বলতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
ঘটনাস্থলে আন্দোলনকারীরা শরিফ ওসমান হাদীর ওপর হত্যাচেষ্টার মূল আসামি গ্রেফতারসহ সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন। পরে দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিলে তারা সরে যান।
জানা গেছে, বিকেএমইএ’র পক্ষ থেকে জেলা পুলিশ ও শিল্প পুলিশ-৪-এর জন্য ছয়টি পুলিশ ভ্যান হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। সেখান থেকেই ফেরার পথে এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যেখানে পুলিশের গাড়ি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাই নিরাপত্তাহীনতায় পড়েন, সেখানে সাধারণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আশ্বস্ত হওয়ার সুযোগ কতটা রয়েছে—তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার চলাচল যদি প্রকাশ্যে এভাবে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রস্তুতি ও গোয়েন্দা তৎপরতার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে ছিল লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার, ওসমান পরিবারের অপরাধীদের গ্রেফতার, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, আওয়ামী লীগের দোসরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তথাকথিত পুনর্বাসন ও তদবির বাণিজ্য বন্ধ। এসব দাবি অনেকাংশেই রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার ও আইনের শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হলেও, তা আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা এড়ানো যায় না। রাজনৈতিক বা সামাজিক দাবির নামে একজন উপদেষ্টাকে অবরুদ্ধ করা কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা আইনের কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ঘটনার পর স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ওসমান হাদী বর্তমানে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন এবং তিনি দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনকারীদের দাবিগুলোকে ‘যৌক্তিক’ উল্লেখ করে বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, আশ্বাসের ভাষা নয়—এ মুহূর্তে প্রয়োজন দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক উদ্যোগ।
এই ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, রাষ্ট্রের ভেতরে জমে থাকা ক্ষোভ, অবিশ্বাস ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সরকার যদি সত্যিই আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে চায়, তবে তা করতে হবে শক্ত হাতে, কিন্তু আইনের ভেতর থেকেই। অন্যথায়, একের পর এক এমন ঘটনা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করবে—যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই বহন করতে হবে।









Discussion about this post