বিশেষ প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জে রাজনীতি যেন থামছেই না। পাঁচটি সংসদীয় আসন ঘিরে বিএনপির মনোনয়ন প্রক্রিয়া একদিকে যেমন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি করেছে প্রশ্ন, বিভ্রান্তি ও গুঞ্জনের ঘন কুয়াশা। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের সিদ্ধান্ত, স্থানীয় নেতৃত্বের অবস্থান এবং প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি এখন এক অদ্ভুত গেরাকলে আবদ্ধ।
প্রথম দফায় বিএনপি দেশের বিভিন্ন আসনের প্রার্থী ঘোষণা করলেও নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে প্রার্থীর নাম অঘোষিত থাকে।
এই শূন্যতা স্থানীয় রাজনীতিতে কৌতূহল ও জল্পনা বাড়িয়ে দেয়।
অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে নজরুল ইসলামের আজাদের নাম ঘোষণার পর পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে। দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাঠে নামে বিএনপিরই একাংশ—নেতাকর্মীরা কাফনের কাপড় পরে আজাদবিরোধী মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদে অংশ নেন। যা বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকাশ্যে এনে দেয়।
সবচেয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় নারায়ণগঞ্জ সদর তথা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনকে ঘিরে।
শুরু থেকেই একাধিক মনোনয়ন প্রত্যাশীর দৌড়ঝাঁপ, দেনদরবার ও গুঞ্জন চলছিল। এই প্রেক্ষাপটে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন সিটিজেন ব্যাংকের কর্ণধার মাসুদুজ্জামান মাসুদ, যিনি সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের ঘনিষ্ঠ ও ব্যবসায়িক অংশীদার হিসেবে পরিচিত। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গিরগিটির মত হঠাৎ করেই নিজেকে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা, চেম্বার অব কমার্স থেকে সংসদ সদস্য হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের গুঞ্জন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তোলে।
মনোনয়ন পাওয়ার পর হঠাৎ করে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে নির্বাচন না করার ঘোষণা, আবার মাত্র দু’দিন পর সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা—মাসুদুজ্জামান মাসুদের এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থান সমালোচনার জন্ম দেয়।
এই নাটকীয়তার মধ্যেই শনিবার ২০ ডিসেম্বর সকাল থেকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে—নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপি নতুন করে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে।
দিনের শেষে সেই গুঞ্জন বাস্তবে রূপ নেয়।
বিকেলে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নিজেই ঘোষণা দেন, নারায়ণগঞ্জ সদর আসনে বিএনপি তাকে প্রার্থী করেছে।
তিনি সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম, আবু আল ইউসুফ খান টিপুসহ বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের দপ্তরে ও বাসায় গিয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তবে এখানেই শেষ নয় নাটক।
মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আলী ইউসুফ খান টিপু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অত্যন্ত কৌশলী ভাষায় একটি স্ট্যাটাস দেন, যা অনেকের চোখে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি কঠোর সমালোচনা হিসেবেই ধরা পড়ে। এতে করে বিভ্রান্তি আরও গভীর হয়।
এরপর শনিবার ২০ ডিসেম্বর রাতের বেলায় নতুন করে গণমাধ্যমে আসে মাসুদুজ্জামান মাসুদের বক্তব্য। তিনি নেতাকর্মীদের ‘বিভ্রান্ত ও বিচলিত না হওয়ার’ আহ্বান জানিয়ে দাবি করেন, আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে তার প্রার্থিতা বহাল রয়েছে।
একই সময়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানান, সারাদেশের প্রার্থী তালিকা দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা করেই চূড়ান্ত করা হয়েছে।
একদিকে স্থানীয় পর্যায়ে এক প্রার্থীর ঘোষণা, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্যে তালিকা চূড়ান্ত—এই দুইয়ের মধ্যকার সাংঘর্ষিক বার্তা নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সাধারণ নেতাকর্মী থেকে শুরু করে ভোটারদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে সংশয়—আসল সিদ্ধান্ত কোনটি ?
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি এখন মনোনয়ন যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের এক জটিল অধ্যায়ে দাঁড়িয়ে।
এই পরিস্থিতি শুধু বিএনপির সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নয়, আসন্ন নির্বাচনে দলটির জনসমর্থন ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রশ্ন থেকে যায়—এই অদ্ভুত গেরাকল কবে খুলবে, আর শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ থাকবে কার হাতে ?









Discussion about this post