নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানা এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ, আতঙ্ক ও দখলদারিত্বের প্রতীক হয়ে ওঠা দুটি নাম—বজলুর রহমান ওরফে কুখ্যাত সন্ত্রাসী হাজি রিপন এবং তার ছেলে ইমতিয়াজ আহম্মেদ রাফি। নগরবাসীর কাছে বজলুর রহমান নামটি অপরিচিত হলেও ‘হাজি রিপন’ নামটি শুনলেই অনেকেই চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও সন্ত্রাসী তৎপরতার কথা স্মরণ করেন।
অপরাধ যেন এই পরিবারের রক্তে। হাজি রিপনের আরেক ছেলে সালেহ রহমান ওরফে সীমান্ত দেশের বহুল আলোচিত ত্বকী হত্যা মামলার স্বীকারোক্তি প্রদানকারী আসামিদের একজন। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর বর্তমানে সে পলাতক। আর পিতা হাজি রিপন ও ছোট ছেলে রাফি—এই দুইজন দীর্ঘদিন ধরে আজমেরী ওসমানের নির্দেশনায় একটি সশস্ত্র ক্যাডার নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে এলাকায় সক্রিয় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরাধের জন্যই স্থানান্তর, অপরাধেই সম্পদের পাহাড়
পৈত্রিক নিবাস মুন্সীগঞ্জ হলেও অপরাধ কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালানোর লক্ষ্যেই হাজি রিপন একসময় পুরো পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাঁদাবাজি, জমি দখল, নারী কেলেংকারী, মাদক কারবার ও ভয়ভীতির মাধ্যমে গড়ে ওঠে বিপুল অর্থবিত্ত। আজ তারা নারায়ণগঞ্জেই স্থায়ী, প্রভাবশালী ও বিতর্কিত এক পরিবার।
এলাকাবাসীর ভাষায়, “এই পরিবারটির প্রায় সবাই কোনো না কোনো অপরাধে যুক্ত—এ যেন অপরাধের উত্তরাধিকার।”
গ্রেফতার: আলোচনায় ফের অপরাধচক্র ।”
ফতুল্লা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আব্দুল মান্নান-এর দিকনির্দেশনায় পুলিশের একটি আভিযানিক দল সোমবার (২২ ডিসেম্বর ২০২৫) দুপুর ২টা ৫ মিনিটে ফতুল্লার জামতলা এলাকার ধোপাপট্টি থেকে হাজি রিপন (৫৫) ও তার ছেলে রাফি (২৯)-কে গ্রেফতার করে।
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যার মধ্যে মাদক সংক্রান্ত মামলাও আছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো—বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত একটি হত্যা মামলার পলাতক আসামি আজমেরী ওসমানের অস্ত্রধারী ক্যাডার হিসেবে তাদের নাম পুলিশের নথিতে রয়েছে।
আজমেরী ওসমানের ‘ক্যাডার নেটওয়ার্ক’
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বজলুর ও রাফি দীর্ঘদিন ধরে আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে এলাকায় সক্রিয় ছিলেন। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আন্দোলন-সংঘর্ষের সময় তারা ভীতি সৃষ্টি, প্রতিপক্ষ দমন এবং প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত—এমন অভিযোগ একাধিক সূত্রের।
স্থানীয়রা বলছেন, অদৃশ্য এক রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ার কারণে এই চক্রটি দিনের পর দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল।
চাঁদাবাজি ও ভূমি দখল : নীরব ভুক্তভোগীদের কান্না
নিউ চাষাড়া, জামতলা নিতািইগঞ্জ ও শহরের আশপাশের এলাকায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়—
# দোকান, মার্কেট ও পরিবহন খাত থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়
# বিরোধপূর্ণ জমিতে ভয়ভীতি দেখিয়ে দখল
# জমি সংক্রান্ত বিরোধে সন্ত্রাসী চাপ সৃষ্টি
ভুক্তভোগীরা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক। তাদের ভাষায়, “মুখ খুললে মামলা, হামলা বা এলাকা ছাড়ার ভয় ছিল।”
মাদক ও সামাজিক অবক্ষয়
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, হাজি রিপন–রাফি চক্র ফতুল্লা এলাকায় ইয়াবা ও গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের সরবরাহ ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত ছিল। বিশেষ করে তরুণদের লক্ষ্য করে এই মাদক ব্যবসা বিস্তারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে এলেও তারা এতদিন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে ছিল—যা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে এলাকাবাসীর।
নারী হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, এই চক্রের বিরুদ্ধে নারীদের হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে অপমানের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো আদালতে নিষ্পত্তি হয়নি, তবুও সামাজিকভাবে ভয় ও আতঙ্ক ছড়ানোর অস্ত্র হিসেবে এসব পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
প্রশাসনের বক্তব্য
ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ জানায়, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা রয়েছে, সেগুলো তদন্তাধীন। অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বড় প্রশ্ন : শুরু নাকি শেষ ?
এই গ্রেফতার কি কেবল দুটি নামের পতন, নাকি ফতুল্লা এলাকার দীর্ঘদিনের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙার সূচনা—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে।
আজমেরী ওসমানের মতো পলাতক আসামিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধেও কি সত্যিকারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
নাকি সবকিছু আবারও সীমাবদ্ধ থাকবে বিচ্ছিন্ন অভিযানে ?
নারায়ণগঞ্জ মহানগরীসহ ফতুল্লার সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—অভিযান যেন থেমে না যায়, অপরাধীর পরিচয় যাই হোক না কেন, আইনের শাসন যেন দৃশ্যমান হয়।









Discussion about this post