নিজস্ব প্রতিবেদক :
সরকারি তেল ডিপো যেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা, শ্রমিক নেতা ও প্রভাবশালী চোরচক্রের নিরাপদ লুটের আখড়া—এ অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু একের পর এক ঘটনা ঘটলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তেল চুরির সিন্ডিকেট আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এরই সর্বশেষ প্রমাণ মিলেছে সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল মেঘনা ডিপোতে।
আজ মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে চালান ছাড়াই সরকারি ডিপো থেকে প্রায় চার লাখ টাকা মূল্যের ডিজেল বহনের সময় ১৫ ড্রাম তেলভর্তি একটি পিকআপ ভ্যান আটক করেন স্থানীয় ট্যাংকলরি শ্রমিকরা। শ্রমিকদের দাবি, ‘রাব্বী ট্রেডার্স’-এর নামে কোনো বৈধ চালান ছাড়াই তেল বের করার চেষ্টা চলছিল, যা ডিপোতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান তেল চুরি ও অনিয়মেরই অংশ।
শ্রমিকদের অভিযোগ অনুযায়ী, ডিপোর সহকারী মহাব্যবস্থাপক মাহবুবুর রহমান ও সহকারী ম্যানেজার (অপারেশন) মাসুদ হাসান দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অনিয়ম আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তাদের অপসারণের দাবিতে শ্রমিকরা বিক্ষোভে নামলে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। গোদনাইল মেঘনা ডিপোতে এর আগেও একাধিকবার অনিয়ম ও তেল চুরির অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছর তদন্তের পর ডিপো ম্যানেজার মোশারফকে বদলি করা হলেও মূল সিন্ডিকেট অক্ষতই থেকে গেছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছিল—চালান ছাড়া কোনো গাড়ি লোডিং পয়েন্টে ঢুকতে পারবে না। অথচ বাস্তবে সেই নির্দেশনা কাগজেই সীমাবদ্ধ।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মোহম্মদ আব্দুল বারিক জানিয়েছেন, প্রথমে চালান ছাড়াই গাড়িটি বের হয়ে যায়। পরে স্থানীয়রা আটক করলে ভেতর থেকে চালান আনা হয়—যা পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।
এদিকে, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে আরও ভয়ংকর পটভূমি। মাত্র কিছুদিন আগেই ফতুল্লায় লক্ষ লিটার তেল চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়। সেই ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার হন এক শ্রমিক নেতা। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত তেল চোরচক্রের গডফাদার হিসেবে উঠে আসে ‘ব্রাজিল বাড়ির টুটুল’ নামটি।
অভিযোগ রয়েছে, তাকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আড়াল করে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় এবং পরে প্রশাসনের অসাধু অংশের সঙ্গে আঁতাত করে প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে তাকে ছাড়িয়ে আনা হয়।
এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ এখনো জনসমক্ষে স্পষ্ট হয়নি, তদন্তের অগ্রগতিও প্রশ্নবিদ্ধ। এর এক মাস না যেতেই সিদ্ধিরগঞ্জে ফের তেল চুরির ঘটনা প্রমাণ করে—চক্রটি শুধু টিকে নেই, বরং আরও সাহসী হয়ে উঠেছে।
সরকারি ডিপোতে এ ধরনের অনিয়ম কেবল রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিই নয়, এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও প্রভাবশালী অপরাধচক্রের দাপটের নগ্ন উদাহরণ। নাম বদলায়, কর্মকর্তা বদলি হয়—কিন্তু চোরচক্র রয়ে যায় অদৃশ্য আশ্রয়ে।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই চক্রের গডফাদারদের বিরুদ্ধে কি আদৌ হাত বাড়ানো হবে, নাকি প্রতিবারের মতো তদন্ত, বদলি আর আশ্বাসেই শেষ হবে সরকারি তেল লুটের অধ্যায় ?









Discussion about this post