নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন নানাভাবে বিতর্কিত নয় লাইখ্যা ডাকাত সর্দার হিসেবে সর্বজন স্বীকৃত মোহাম্মদ আলী।
আজ রোববার (২৮ ডিসেম্বর) ফতুল্লার ডালডাগেইট এলাকায় তার নিজ বাসভবনের সামনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভা থেকে তিনি এই ঘোষণা দেন এবং আগামীকাল মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করবেন বলেও জানান।
তবে ঘোষণার মঞ্চেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ভিন্ন এক বাস্তবতা। সভাস্থলে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা-কর্মী, ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজন এবং নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী দোসরদের প্রকাশ্য উপস্থিতি ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে কঠোর নজরদারি বসানো হয়—যাতে কেউ ছবি তুলতে বা রেকর্ডিং করতে না পারে।
‘স্বতন্ত্র’ নয়, বরং আওয়ামী দোসরদের অর্থায়নের অভিযোগ
বৈঠকে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মোহাম্মদ আলীর এই নির্বাচন প্রকৃত অর্থে জনগণের প্রতিনিধিত্বের জন্য নয়, বরং আওয়ামী দোসর অর্থাৎ ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী সদস্য সেলিম ওসমান ও স্বামী ওসমানের অর্থায়নে নারায়ণগঞ্জে পুরনো স্বৈরাচারী বলয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি কৌশল।
এই সভায় গডফাদার শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের ঘনিষ্ঠ আস্থাভাজনদের উপস্থিতি সেই অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদ আলী নিজেকে ‘কিং মেকার’ হিসেবে উপস্থাপন করলেও নারায়ণগঞ্জবাসীর কাছে তিনি মূলত নিজের স্বার্থসিদ্ধিতেই সক্রিয় ছিলেন এবং নগরীর অনেকেই তাকে ‘কিং জোকার’ হিসেবেই চিনেন। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক উপস্থিতির পরও এলাকার উন্নয়ন, জনস্বার্থ বা সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর কোনো দৃশ্যমান দলিল দেখাতে পারেননি কেউ।
ভাতিজাদের সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য ও আইন অমান্যতার অভিযোগ
একই সাথে মোহাম্মদ আলী ও তার পরিবারের প্রায় সকলের বিরুদ্ধেও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, তার ভাতিজারা নারায়ণগঞ্জ-৪ এর বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছে। তেলচুরি, ভূমিদস্যুতা, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারসহ সকল ধরনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ভাতিজা সাবেক চেয়ারম্যান লিটনের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র হত্যা মামলা সহ একাধিক মামলা থাকলেও তিনি অদৃশ্য শক্তির ছায়াতলে থেকে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ।
আওয়ামী শাসনামলে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে তিনি নানা অপকর্ম চালিয়েছেন, যা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
অন্য ভাতিজা সারজিস আলম অভি চাঁদাবাজি, ব্ল্যাকমেইলিং, মাদক ব্যবসা, পঞ্চবটিতে সরকারি জমি দখল, ফুটপাত থেকে চাঁদা আদায় ও ঝুট সন্ত্রাসের মাধ্যমে পুরো এলাকায় আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। পঞ্চবটি, ধর্মগঞ্জ ও প্রেমরোড এলাকার সাধারণ মানুষ তার ভয়ে সন্ত্রস্ত জীবন যাপন করছেন। এলাকাবাসী তাকে ‘দ্বিতীয় ফরিদ’ উপাধিতে আখ্যায়িত করেছেন—যা তার সন্ত্রাসী পরিচয়েরই প্রতিফলন।
ভোটারদের শঙ্কা: ক্ষমতায় গেলে অপ্রতিরোধ্য হবে চক্র
স্থানীয় ভোটারদের মধ্যে প্রবল আশঙ্কা—ক্ষমতায় না এসেই যদি এত অপকর্ম চলে, তবে মোহাম্মদ আলী এমপি হলে এই চক্র কতটা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে তা সহজেই অনুমেয়। অনেকেই মন্তব্য করছেন, মোহাম্মদ আলীকে ভোট দেওয়া মানেই আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসরদের পুনর্বাসনে সহায়তা করা।
১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনে নারায়ণগঞ্জ-৪ এর মানুষ যে দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে, মোহাম্মদ আলী নির্বাচিত হলে সেই অন্ধকার অধ্যায় আবারও ফিরে আসবে—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সর্বত্র।
বয়কটের ডাক ও বিকল্প নেতৃত্বের দাবি
এই বাস্তবতায় অনেক সাধারণ ভোটার প্রকাশ্যে মোহাম্মদ আলীকে বয়কটের আহ্বান জানাচ্ছেন।
তাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ-৪ এর ভবিষ্যৎ রক্ষায় নতুন, পরিচ্ছন্ন ও জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
সব মিলিয়ে, স্বতন্ত্রপ্রার্থী মোহাম্মদ আলীর নির্বাচনী ঘোষণা নারায়ণগঞ্জ-৪ এ নতুন আশার বদলে পুরনো আতঙ্ক ও গভীর অনিশ্চয়তার বার্তাই বহন করছে—যা এই আসনের ভোটারদের সামনে বড় সিদ্ধান্তের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।









Discussion about this post