নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনে মোট ৫৭ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ঘটনাটি কেবল একটি নির্বাচনী পরিসংখ্যান নয়—এটি জেলার রাজনীতির গভীর সংকট, আদর্শিক দুর্বলতা এবং নেতৃত্বহীনতার নগ্ন প্রতিচ্ছবি।
মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা গণতন্ত্রের প্রতিযোগিতার চেয়ে অনেক বেশি মনোনয়ন বাণিজ্য, দলীয় শৃঙ্খলার ভাঙন এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির বিপজ্জনক বিস্তারকেই স্পষ্ট করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন একাধিক আসন থেকে (নারায়ণগঞ্জ-৩ ও নারায়ণগঞ্জ-৪) স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
একটি রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় সাবেক নেতার এ ধরনের আচরণ প্রশ্ন তোলে—দলীয় রাজনীতি কি তবে সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে ?
নাকি নির্বাচন এখন ব্যক্তিগত প্রভাব যাচাইয়ের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে ?
আসনভিত্তিক চিত্র: গণতন্ত্র না কি বিশৃঙ্খলা ?
নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে বিএনপি থেকে একাধিক প্রার্থী—মোহাম্মদ দুলাল ও মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু—মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। একই আসনে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, কমিউনিস্ট পার্টি, গণ অধিকার পরিষদসহ একাধিক দলের উপস্থিতি রাজনৈতিক বৈচিত্র্যের চেয়ে বরং ভোট বিভাজনের আশঙ্কাই বাড়িয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনে ১০ জন প্রার্থী থাকলেও বিএনপির ভেতরের প্রতিযোগিতা আবারও চোখে পড়ার মতো—নজরুল ইসলাম আজাদ ও আতাউর রহমান খান আঙ্গুর একই দলের হয়ে মাঠে নামছেন। এতে স্পষ্ট, দলীয় সিদ্ধান্তের চেয়ে ব্যক্তি আগ্রহই এখানে মুখ্য হয়ে উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে ১১ জন প্রার্থীর তালিকা যেন রাজনৈতিক পরীক্ষাগার। এখানে বিএনপি, জামায়াত, খেলাফত, গণসংহতি আন্দোলন, আমার বাংলাদেশ পার্টি—সবাই আছে। কিন্তু সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো—এই আসনেই স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন ও অধ্যাপক রেজাউল করিম।
প্রশ্ন উঠছে, দলীয় প্রার্থীর ভিড়ে স্বতন্ত্রদের এই উপস্থিতি আদর্শিক রাজনীতির কোন বার্তা দেয় ?
নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা) আসনে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। এখানে একই দলের একাধিক প্রার্থী, বিভিন্ন নামসর্বস্ব দল এবং রাজনৈতিকভাবে অপরিচিত মুখের আধিক্য নির্বাচনকে গুরুতরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে এই আসনে আবারও স্বতন্ত্র হিসেবে গিয়াস উদ্দিনের উপস্থিতি রাজনৈতিক শালীনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে জনমনে গভীর সংশয় সৃষ্টি করেছে।
নারায়ণগঞ্জ-৫ (সদর-বন্দর) আসনে ১৩ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। বিএনপি থেকে তিনজন—আবুল কালাম, আবু জাফর আহমদ বাবুল ও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান—মনোনয়ন জমা দেওয়ায় দলীয় শৃঙ্খলার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আদর্শিক রাজনীতির বদলে এখানে স্পষ্টতই চলছে ব্যক্তি প্রভাব ও সংগঠনগত দুর্বলতার প্রতিযোগিতা।
বড় প্রশ্ন: ভোটার কোথায় ?
এই বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর ভিড়ে সবচেয়ে অনুপস্থিত যিনি—তিনি হলেন ভোটার। কোথাও কর্মসূচির কথা নেই, নেই জনদাবির প্রতিফলন, নেই এলাকার বাস্তব সমস্যার সুস্পষ্ট রূপরেখা। অধিকাংশ মনোনয়নই যেন রাজনৈতিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার নয়, বরং ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার একটি প্রচেষ্টা।
রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত ছিল প্রার্থী বাছাইয়ে কঠোরতা, নৈতিক মানদণ্ড ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে—মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে রাজনৈতিক প্রস্তুতি।
উপসংহার
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনে ৫৭ জন প্রার্থীর মনোনয়ন জমা দেওয়ার ঘটনা যদি রাজনৈতিক সজীবতার পরিচায়ক বলে দাবি করা হয়, তবে তা হবে আত্মপ্রবঞ্চনা। বাস্তবতা হলো—এটি দলীয় ভাঙন, আদর্শিক শূন্যতা ও নেতৃত্বের গভীর সংকটের একটি স্পষ্ট দলিল।
এখন প্রশ্ন একটাই—এই ভিড়ের রাজনীতি থেকে কি সত্যিকারের জনপ্রতিনিধি উঠে আসবে, নাকি নির্বাচন শেষে আবারও প্রমাণ হবে যে গণতন্ত্র কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ ?
নারায়ণগঞ্জবাসী এখন সেই উত্তরের অপেক্ষায়।









Discussion about this post