নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজার সিটি কলোনি যা মেথরপট্টি হিসেবে পরিচিত—এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরেই মাদক কারবারিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত।
থার্টি ফার্স্ট নাইটকে ঘিরে এবার সেখানে আয়োজন করা হয়েছিল বিশাল মদের উৎসব।
দেশি-বিদেশি মদের বিপুল মজুদ, প্রকাশ্য কেনাবেচা এবং শহরের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ—সবই চলছিল প্রশাসনের নাকের ডগায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন নারায়ণগঞ্জের অন্তত দুটি বৈধ মদের দোকান থেকে বিপুল পরিমাণ মদ উত্তোলন করে মেথরপট্টির কয়েকজন চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী তা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিত।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জ থানা ও টান বাজার পুলিশ ফাঁড়ি থেকে মাত্র কয়েক গজ দূরত্বেই দিনের পর দিন এই অবৈধ কার্যক্রম চললেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, টানবাজার পুলিশ ফাঁড়ি ও নারায়ণগঞ্জ সদর থানা পুলিশের কন্সষ্টেবল থেকে শুরু করে দারোগা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিয়ে এই মাদক ব্যবসা নির্বিঘ্নে চালিয়ে আসছিল কারবারিরা।
ফলে এলাকাটি কার্যত পরিণত হয় একটি “ওপেন ড্রাগ জোনে”, যেখানে আইন যেন অদৃশ্য।
একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে টানবাজারের সেন এন্ড কোম্পানির কর্ণধার গিয়াস উদ্দিন রুবেল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল ও চোরাই মদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করছেন।
থানা পুলিশ, ডিবি, পুলিশ সুপার কার্যালয়সহ বিশেষ পেশার কিছু প্রভাবশালী অপরাধীদের ‘ম্যানেজ’ করে তিনি নিজেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রাখছেন বলে অভিযোগ।
এ কারণেই চোরাই মদের গডফাদার হিসেবে পরিচিত রুবেলের বিরুদ্ধে কার্যত কেউ টিকিটও কাটতে সাহস পায় না।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের নীরবতা যখন জনমনে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে, ঠিক তখনই দৃশ্যপটে আসে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি)।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) দুপুরে টানবাজার সিটি কলোনিতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে দেশি ও বিদেশি মিলিয়ে ৫০ লিটারের বেশি মদ উদ্ধারসহ এক মাদক কারবারিকে গ্রেপ্তার করে সংস্থাটি।
গ্রেপ্তারকৃতের নাম গোবিন্দ দাস (৩২)।
ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মেহেদী হাসান জানান, থার্টি ফার্স্টকে কেন্দ্র করে মাদক সেবন ও অবৈধ মদ সরবরাহ বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিটি কলোনিতে অভিযান চালানো হলে বিপুল পরিমাণ মদ উদ্ধার হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গোবিন্দ দাস স্বীকার করেন, নতুন বছর উপলক্ষে বিক্রির উদ্দেশ্যেই তিনি এসব মদ মজুত করেছিলেন।
ডিএনসির অভিযানের খবরে টানবাজার সিটি কলোনির কয়েকজন কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী পালিয়ে যায় বলেও জানা গেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—যে এলাকায় বছরের পর বছর প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চলে, যেখানে পুলিশের ফাঁড়ির পাশেই গড়ে ওঠে মদের গুদাম, সেখানে হঠাৎ করে শুধু একজন ধরা পড়া কি আদৌ যথেষ্ট ?
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মাদক ব্যবসার মূল গডফাদার, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রভাবশালী মহল এবং যেসব কর্মকর্তা দায়িত্বে থেকেও নীরব থেকেছেন—তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
নচেৎ, আজ একজন ধরা পড়লেও কাল আবার নতুন নামে, নতুন মুখে টানবাজারে ফিরে আসবে সেই পুরনো মদের রাজত্ব—আর আইন থাকবে শুধু আইনের গেরাকলে।









Discussion about this post