নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নজরুল ইসলাম আজাদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে উঠে এসেছে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক চিত্র। নিজের নামে কোনো ব্যক্তিগত গাড়ি বা বাড়ি না থাকলেও তার নামে রয়েছে প্রায় ২৭ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ। একই সময়ে গত সাত বছরে তার স্ত্রী খন্দকার নাঈমা নুসরাতের সম্পদ বেড়েছে ৮৪১ গুণ, যা স্বাভাবিক আয়-ব্যয়ের হিসাবকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা অনুযায়ী, পেশায় ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম আজাদের বাৎসরিক আয় মাত্র ৯ লাখ ৪ হাজার টাকা। অথচ তার স্ত্রী, যার বাৎসরিক আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৭ লাখ টাকা, বর্তমানে ১৬ কোটি ৮২ লাখ টাকার মালিক। ২০১৮ সালে যেখানে স্ত্রীর নামে ছিল মাত্র ২ লাখ টাকা নগদ, সেখানে এখন শুধু নগদ অর্থই রয়েছে ১৪ কোটির বেশি।
ব্যবসার পরিচয় নেই, অথচ কোটি কোটি টাকা !
হলফনামায় আজাদ ও তার স্ত্রীর ব্যবসার ধরন, প্রকৃতি কিংবা বিনিয়োগ খাত সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট তথ্য নেই। সীমিত আয় দেখিয়েও এত বিপুল সম্পদ কীভাবে অর্জিত হলো—সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যাও নেই হলফনামায়। আয়কর নথি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে আজাদ দিয়েছেন মাত্র ৫৮ হাজার টাকা, আর তার স্ত্রী দিয়েছেন ৩৫ হাজার টাকা আয়কর—যা তাদের ঘোষিত সম্পদের তুলনায় নিতান্তই নগণ্য।
ব্যাংক ঋণ ও খেলাপির অতীত
নজরুল ইসলাম আজাদ বেসিক ব্যাংক লিমিটেডের গুলশান শাখা থেকে নেওয়া মেসার্স এস অ্যান্ড জে স্টীল মিল নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ৪০ শতাংশ অংশীদার। এই প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে বর্তমানে তার নামে ঋণ রয়েছে ২৭ কোটি ৩ লাখ টাকা। অথচ ২০১৮ সালে একই প্রতিষ্ঠানের নামে তার ঋণের পরিমাণ ছিল ৭১ কোটির বেশি।
প্রশ্ন উঠছে—এই বিপুল ঋণ কীভাবে পরিশোধ হলো, আর তার দায় কীভাবে কমে এলো?
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণ দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি ইস্যু, যেখানে রাজনৈতিক প্রভাব ও অস্বচ্ছ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়।
গাড়ি কেলেঙ্কারি ও বিতর্কিত অতীত
আজাদের রাজনৈতিক জীবনে বিতর্ক নতুন নয়। অতীতে গাড়ি কেলেঙ্কারিসহ একাধিক ঘটনায় তার নাম উঠে এসেছে আলোচনায়। যদিও বর্তমানে হলফনামায় তার বা তার পরিবারের নামে কোনো ব্যক্তিগত গাড়ির উল্লেখ নেই, তবুও অতীতের এসব ঘটনা তার আর্থিক ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
মামলা ও আইনি জটিলতা
হলফনামা অনুযায়ী, নজরুল ইসলাম আজাদের বিরুদ্ধে মোট ২৬টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ২৪টিতে তিনি খালাস পেলেও একটি বিস্ফোরক আইনের মামলা এখনো চলমান। এছাড়া অর্থঋণ আদালতের একটি মামলা আপসের মাধ্যমে স্থগিত রয়েছে। ২০১৮ সালে তার বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা ছিল ১৪টি—অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মামলার সংখ্যাও বেড়েছে।
জনস্বার্থে প্রশ্ন
একজন সংসদ সদস্য প্রার্থীর ক্ষেত্রে আয়, সম্পদ, ঋণ ও আইনি অবস্থান জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সীমিত আয়ের বিপরীতে স্ত্রীর নামে শতগুণ সম্পদ বৃদ্ধি, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল ঋণ এবং অতীতের বিতর্ক—সব মিলিয়ে নজরুল ইসলাম আজাদকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর প্রশ্ন ও সংশয়ের আবহ।
নির্বাচনের প্রাক্কালে এসব প্রশ্নের জবাব না এলে, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের ভোটারদের সামনে আরেকটি বড় প্রশ্ন থেকেই যাবে—এ সম্পদের উৎস কোথায়, আর এই ঋণের দায় শেষ পর্যন্ত কার কাঁধে ?









Discussion about this post