শেখ আরিফ (বন্দর থেকে) :
শীত এলেই গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড়ের চাহিদা বাড়ে কয়েকগুণ। নতুন গুড়ের ঘ্রাণে মুখর হয়ে ওঠে হাট-বাজার। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের আড়ালেই নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলাসহ সারাদেশে গড়ে উঠেছে ভেজাল খেজুরের গুড়ের ভয়ংকর কারবার। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—খাঁটি গুড়ের নামে প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছেন হাজারো ভোক্তা, ঝুঁকির মুখে পড়ছে জনস্বাস্থ্য।
বন্দরজুড়ে ভেজাল গুড়ের অবাধ বাণিজ্য
সরেজমিনে বন্দর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, শীতের শুরু থেকেই খেজুর রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রকৃত গুড় প্রস্তুতকারীরা। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করছেন—এ যেন গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য।
কিন্তু এই খাঁটি উৎপাদনের আড়ালে কিছু অসাধু চক্র চিনিসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ও নিম্নমানের উপকরণ মিশিয়ে তৈরি করছে ভেজাল গুড়। এসব ভেজাল গুড় বন্দর উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভেজাল গুড় দেখতে খাঁটির মতো হলেও স্বাদ ও গন্ধে পার্থক্য থাকছে। অনেক ক্ষেত্রে রঙ গাঢ় করতে ব্যবহার করা হচ্ছে চিনি, ক্যারামেল ও অজ্ঞাত উপাদান।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও ভোক্তাদের অভিযোগ
ভেজাল গুড় খেয়ে অনেকেই পেটের সমস্যা, ডায়রিয়া, গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভোক্তা জানান,
“খাঁটি গুড় ভেবে কিনেছিলাম, খাওয়ার পর থেকেই পেটে সমস্যা শুরু হয়। পরে জানতে পারি ওটা ভেজাল।”
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন ভেজাল গুড় গ্রহণ করলে লিভার ও পরিপাকতন্ত্রের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতি
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ভেজাল গুড়ের ব্যবসা প্রকাশ্যে চললেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর কোনো নজরদারি চোখে পড়ছে না। স্থানীয় হাট-বাজারগুলোতে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত বা মান নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
একাধিক সচেতন নাগরিক অভিযোগ করে বলেন, “যদি নিয়মিত অভিযান থাকত, তাহলে এমন ভেজাল ব্যবসা এতটা ছড়াতে পারত না।”
শুধু বন্দর নয়, সারাদেশেই একই চিত্র
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন্দর উপজেলার এই চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়—বিশেষ করে শীত মৌসুমে—ভেজাল গুড় উৎপাদন ও বিপণনের একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও কারখানার আদলে গড়ে উঠেছে ভেজাল গুড় তৈরির গোপন ইউনিট।
ভোক্তাদের দাবি ও করণীয়
ভোক্তারা দাবি জানিয়েছেন—
# ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নিয়মিত বাজার তদারকি ভেজাল
# গুড় উৎপাদক ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা
# খাঁটি গুড় চিহ্নিত করতে নির্দিষ্ট মানদণ্ড ও লেবেলিং ব্যবস্থা
# গাছি ও প্রকৃত গুড় প্রস্তুতকারীদের প্রণোদনা ও সুরক্ষা
সচেতন মহলের মতে, প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই ভেজালচক্র ভাঙা সম্ভব নয়।
উপসংহার
খেজুরের গুড় শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়—এটি গ্রামবাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। সেই ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে ভেজাল গুড়ের রমরমা ব্যবসা চলতে থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনস্বাস্থ্য ও বিশ্বাসযোগ্যতা। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে—এমনটাই আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।








Discussion about this post