নিজস্ব প্রতিবেদক :
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে প্রকাশ্যে পিস্তল উঁচিয়ে গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টিকারী কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ মোঃ সোহাগ অবশেষে যৌথ বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার হলেও, এ গ্রেপ্তার স্বস্তির চেয়ে বেশি প্রশ্নই জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এতদিন সে কার ছত্রছায়ায় ছিল এবং কীভাবে পুলিশের চোখের সামনেই অস্ত্র ও মাদক সাম্রাজ্য গড়ে তুললো ?
সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি) ভোর সাড়ে ৩টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকায় পরিচালিত অভিযানে সোহাগ (৩৪) ও তার দুই সহযোগী আব্দুল জলিল (২৫) এবং মোঃ পারভেজ (২৪) গ্রেপ্তার হয়। অভিযানে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তবে স্থানীয়দের মতে, এই গ্রেপ্তার পুলিশের সাফল্যের চেয়ে বরং দীর্ঘদিনের ব্যর্থতা ও দায়িত্বহীনতারই প্রমাণ।
প্রকাশ্য অপরাধ, নীরব পুলিশ
গত ৬ মার্চ ২০২৫ তারিখে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি চালানোর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেও প্রায় দশ মাস ধরে সোহাগ ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রশ্ন উঠেছে—ভিডিও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ? কেন তাকে আত্মগোপনে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো ?
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সময়কালে পুলিশের বিদায়ী ও বর্তমান কয়েকজন কর্মকর্তা “ম্যানেজ” হয়ে সোহাগের মাদক ও চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য নির্বিঘ্নে চলতে দেন। থানা এলাকার বিভিন্ন মাদক স্পট থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে পুলিশের একাংশের বিরুদ্ধে। অস্ত্রধারী সোহাগ ছিল সেই অবৈধ ব্যবস্থাপনার অন্যতম ‘কার্যকর হাতিয়ার’।
নৈতিকতা কোথায় ?
সিদ্ধিরগঞ্জের সচেতন নাগরিকরা বলছেন, পুলিশ প্রশাসনের নৈতিক বিচ্যুতি ও অভ্যন্তরীণ দুর্নীতিই এমন অপরাধীদের শক্তি জোগায়। থানা পুলিশ ও প্রভাবশালী একটি চক্রের মদদ ছাড়া প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহার ও দীর্ঘদিন মাদক ব্যবসা চালানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের মতে, শুধু মাঠপর্যায়ের অপরাধী গ্রেপ্তার করে দায় সারা হলে চলবে না—বরং পুলিশের ভেতরে থাকা অপরাধের পৃষ্ঠপোষকদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
স্বচ্ছ তদন্তের দাবি
সচেতন মহলের জোর দাবি, সোহাগের মোবাইল ফোনের কললিস্ট, মেসেজিং অ্যাপ ও আর্থিক লেনদেন (মোবাইল ব্যাংকিং) আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে হবে। এতে তার শেল্টারদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও মূল হোতারা সহজেই চিহ্নিত হবে।
অনেকেই মনে করছেন, এই তদন্ত থানা পুলিশকে বাদ দিয়ে কোনো নিরপেক্ষ ও বিশেষায়িত তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে পরিচালনা করা জরুরি। কারণ, অভিযুক্ত কাঠামোর মধ্যেই তদন্ত হলে সত্য বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
শেষ কথা
সিদ্ধিরগঞ্জবাসীর ভাষায়, “একজন সোহাগ ধরা পড়লে আরেকজন তৈরি হবে—যদি না নেপথ্যের রাঘববোয়ালদের ধরা হয়।” পুলিশের ব্যর্থতা ও নৈতিকতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের কঠোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না করলে নারায়ণগঞ্জ থেকে সন্ত্রাস ও মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
এই গ্রেপ্তার যদি সত্যিকারের পরিবর্তনের সূচনা হয়, তবে তা প্রমাণ করতে হবে স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং শেল্টারদাতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার মাধ্যমে। না হলে এটি আর দশটা “নাটকীয় গ্রেপ্তার”-এর মতোই ইতিহাসে হারিয়ে যাবে।









Discussion about this post