নারায়ণগঞ্জে নারী প্রার্থী শূন্য, জাতীয় রাজনীতিতে পুরুষতন্ত্রের আরেক জয়
নিজস্ব প্রতিবেদক :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে নারীর অংশগ্রহণের হার উদ্বেগজনকভাবে কম। ৩০০ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ২ হাজার ৫৬৮ জন প্রার্থী, যার মধ্যে নারী মাত্র ১০৯ জন—শতাংশের হিসাবে ৪ দশমিক ২৪। এই বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ জেলার চিত্র আরও হতাশাজনক।
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনে প্রায় অর্ধশত প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও একজন নারী প্রার্থীও নেই। নারী নেতৃত্বশূন্য এই চিত্র নারায়ণগঞ্জকে জাতীয় পর্যায়ের নারীবঞ্চনার একটি স্পষ্ট প্রতীক করে তুলেছে।
জাতীয় পর্যায়ে যেখানে সীমিত হলেও নারী প্রার্থীর উপস্থিতি রয়েছে, সেখানে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী জেলায় নারী প্রার্থীর সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি প্রশ্ন তোলে—রাজনৈতিক দলগুলো কি আদৌ নারী নেতৃত্বে বিশ্বাস করে ?
দলগুলোর প্রতিশ্রুতি, বাস্তবতায় দায়সারা
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই দলীয় গঠনতন্ত্রে ও প্রকাশ্য ঘোষণায় কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা হয়নি। নারী রাজনৈতিক অধিকার ফোরামের অভিযোগ, অধিকাংশ দল নারী মনোনয়নের প্রশ্নে দায়সারা আচরণ করেছে। ফলে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নারীর কম অংশগ্রহণকে ‘দুঃখজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন,“নারীরা আমাদের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও বেশি। অথচ নির্বাচনে তাদের প্রতিনিধিত্ব ৫ শতাংশও নয়। এতে আবারও পুরুষতন্ত্রের জয় হলো এবং নারীর অধিকার পরাজিত হলো।”
জাতীয় চিত্রেও বৈষম্য প্রকট
জাতীয়ভাবে বিএনপি থেকে ১০ জন, জাতীয় পার্টি থেকে ৬ জন, এনসিপি থেকে ৩ জনসহ কয়েকটি দল নারী প্রার্থী দিলেও ৫১টি অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে ২৯টি দল একটিও নারী প্রার্থী দেয়নি। জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ বড় কয়েকটি দল শতাধিক মনোনয়ন জমা দিলেও নারীর জন্য কোনো আসন রাখেনি। অথচ এসব দলের অনেকেই অভ্যন্তরীণ কাঠামোয় নারী নেতৃত্বের কথা দাবি করে থাকে।
নারায়ণগঞ্জ : শিল্প ও রাজনীতির কেন্দ্র, নারীর জন্য নয় ?
নারায়ণগঞ্জ জেলার ইতিহাসে শ্রম আন্দোলন, রাজনৈতিক সংগ্রাম ও গণআন্দোলনে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকলেও সংসদ নির্বাচনে তার প্রতিফলন নেই। স্থানীয় রাজনীতিতে নারী নেত্রীদের উপস্থিতি থাকলেও দলীয় মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারা বারবার উপেক্ষিত। বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী পুরুষ রাজনীতি, অর্থনৈতিক শক্তি ও পেশিশক্তিনির্ভর নির্বাচন সংস্কৃতি নারী প্রার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কোটিপতি হলেও সুযোগ সীমিত
জাতীয়ভাবে মনোনয়ন জমা দেওয়া নারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন কোটিপতি হলেও তা দলীয় আস্থার নিশ্চয়তা দিতে পারেনি। অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নারীরা দলীয় সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারছেন না—এটি প্রমাণ করে সমস্যা কেবল সম্পদের নয়, বরং মানসিকতা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির।
পরিবর্তনের দাবি জোরালো
নারীবান্ধব রাষ্ট্র ও টেকসই গণতন্ত্র গড়তে হলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিকল্প নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে,
# দলীয় মনোনয়নে বাধ্যতামূলক নারী কোটা কার্যকর করা
# নারীবান্ধব নির্বাচনী পরিবেশ নিশ্চিত করা
# স্থানীয় রাজনীতি থেকে জাতীয় রাজনীতিতে নারীর উত্তরণে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বাড়ানো
—এই উদ্যোগগুলো এখন সময়ের দাবি।
নারায়ণগঞ্জে নারী প্রার্থী না থাকার ঘটনা শুধু একটি জেলার ব্যর্থতা নয়, এটি জাতীয় রাজনীতিতে নারীর প্রতি দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতিফলন। যদি এই প্রবণতা বদলানো না যায়, তবে গণতন্ত্রের অর্ধেক শক্তি চিরকালই অব্যবহৃত থেকে যাবে।








Discussion about this post