স্টাফ রিপোর্ট
রাজধানী ও আশপাশের জনপদে বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধারের সংখ্যা ক্রমেই উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া ৬৪৩টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ বেওয়ারিশ হিসেবে রাজধানীর বিভিন্ন কবরস্থানে দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। এর মধ্যে রায়েরবাজারে ৪৬১ জন, জুরাইন কবরস্থানে ১৭৫ জন এবং পোস্তগোলা শ্মশানে অন্য ধর্মের সাতজনের লাশ দাহ করা হয়। গড়ে প্রতি মাসে ৫৪ জন এবং প্রতিদিন প্রায় দুজন অজ্ঞাতপরিচয় মানুষের লাশ দাফন হচ্ছে—যা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও তদন্ত সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
এই ভয়াবহ বাস্তবতার সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি স্পষ্ট হয় নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে। পুলিশ ও নৌ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শুধু নদী থেকেই ৪৪০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৪১ জনের পরিচয় আজও শনাক্ত হয়নি। অর্থাৎ উদ্ধার হলেও বিচার ও দায়বদ্ধতার পথটি বারবার থমকে যাচ্ছে।
সংখ্যার ভাষায় ব্যর্থতার চিত্র
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে—এক বছরে ৭৩টি বেশি। ২০১০ থেকে ২০২৪—এই ১৫ বছরে মোট ১৪,৮৭৬টি মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করেছে সংস্থাটি। এসব পরিসংখ্যান কেবল মৃত্যুর নয়; এগুলো তদন্ত ব্যর্থতা, পরিচয় শনাক্তে ঘাটতি এবং অপরাধ দমনে দুর্বলতার দলিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর—১৬ মাসে দেশে ৪,৭৩২টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে। একই সময়ে থানাগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে আড়াই হাজার অপমৃত্যুর মামলা হচ্ছে। অথচ নদী ও সড়ক থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের বড় অংশেই মামলার কূলকিনারা করা যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জ: নদী যেন ‘ডাম্পিং স্টেশন’
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন সামনে রেখে সংঘাত বেড়েছে; তারই ধারাবাহিকতায় যত্রতত্র লাশ উদ্ধার হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের নদীপথগুলো ক্রমে অপরাধীদের কাছে অপরাধ ঢাকার ‘ডাম্পিং স্টেশন’ হয়ে উঠছে। নৌ পুলিশের তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ ও পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় বেশির ভাগ হত্যা মামলার তদন্ত থেমে যায়।
নৌ পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি-জুলাইয়ে দেশজুড়ে ৩০১টি মরদেহ উদ্ধার হয়; ৯২ জন আজও অজ্ঞাতপরিচয়। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের তুলনায় মামলার সংখ্যা কমছে—এ বছর ৪১টি, গত বছর ৫৩টি—যা বিচারপ্রক্রিয়ার শ্লথতার ইঙ্গিত দেয়।
পরিচয় শনাক্তে কাঠামোগত দুর্বলতা
পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, নিখোঁজের ঘটনায় পরিবার ৫–৭ দিন পরে জিডি করায় তদন্তের ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নষ্ট হয়। পচে যাওয়া লাশে আঙুলের ছাপ মিলানো যায় না, আবার ছিন্নমূল ও ভবঘুরে মানুষের এনআইডি না থাকায় পরিচয় শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে তিন দিন পর ময়নাতদন্ত শেষে লাশগুলো বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য হস্তান্তর করা হয়।
দায়িত্ব শেষ হয় না দাফনে
গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনের মতে, লাশ উদ্ধারের সংবাদ প্রকাশই শেষ দায়িত্ব নয়। পরিচয় শনাক্ত করে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। অথচ বাস্তবে সমন্বিত ডেটাবেস, দ্রুত ডিএনএ/বায়োমেট্রিক মিল, নিখোঁজ ব্যক্তির কেন্দ্রীয় তালিকা—এসবের কার্যকর প্রয়োগ অনুপস্থিত।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ জানান, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না এবং লাশ বহনে কোনো খরচ নেওয়া হয় না। অর্থাৎ দাফন প্রক্রিয়া নিয়মতান্ত্রিক হলেও তদন্ত ও শনাক্তকরণের জায়গায় ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।
করণীয়: এখনই পদক্ষেপ দরকার
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—
- নারায়ণগঞ্জসহ নদীবেষ্টিত জেলায় বিশেষ টাস্কফোর্স ও নৌ–স্থল সমন্বিত তদন্ত।
- কেন্দ্রীয় নিখোঁজ ডেটাবেস ও হাসপাতাল-মর্গ-থানা-নৌ পুলিশের রিয়েল-টাইম সংযোগ।
- উদ্ধারকৃত মরদেহে দ্রুত ডিএনএ প্রোফাইলিং ও বায়োমেট্রিক বিকল্প পদ্ধতি।
- নিখোঁজের ঘটনায় তাৎক্ষণিক জিডি বাধ্যতামূলক করতে জনসচেতনতা ও আইনি নির্দেশনা।
- মামলা তদারকিতে স্বতন্ত্র মনিটরিং সেল ও জবাবদিহি।
বেওয়ারিশ লাশের এই দীর্ঘ তালিকা আমাদের ব্যর্থতার আয়না। নারায়ণগঞ্জকে কেন্দ্র করে নদী-নির্ভর অপরাধ দমনে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে, সংখ্যাগুলো কেবল বাড়তেই থাকবে—আর ন্যায়বিচার থাকবে অধরাই।








Discussion about this post