নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় গড়ে ওঠা অপরাধ চক্র যে এখনও সক্রিয়—তারই ভয়ংকর প্রমাণ মিললো কুমিল্লার চান্দিনায়।
যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশির সময় বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ আটক হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ‘হোন্ডা বাহিনী’র সক্রিয় ক্যাডার হাবিবুর রহমান শাকিল ওরফে যোয়াদ শাকিল এবং তার সহযোগী মোহাম্মদ চিশতী। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
গত সোমবার (১৯ জানুয়ারি) রাত পৌনে ৯টার দিকে ঢাকা–চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাধাইয়া বাস স্টেশন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশের অভিযানে ঢাকাগামী ‘এশিয়া এয়ারকন’ পরিবহনের একটি বাস থেকে তাদের আটক করা হয়।
অভিযানকালে উদ্ধার করা হয় একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও এক রাউন্ড গুলি—যা স্পষ্টভাবে পরিকল্পিত সশস্ত্র তৎপরতার ইঙ্গিত দেয়।
আটক হাবিবুর রহমান শাকিল (৩৩) নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি প্রয়াত নাসিম ওসমানের পুত্র ও একাধিক হত্যা মামলার আসামি সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের ঘনিষ্ঠ ক্যাডার হিসেবে পরিচিত।
আজমেরী ওসমান বর্তমানে ভারতে পলাতক। শাকিল দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ শহরের আতঙ্ক হিসেবে পরিচিত ‘হোন্ডা বাহিনী’র সদস্য বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
অন্যদিকে, আটক মোহাম্মদ চিশতী (৪২) বন্দর উপজেলার লক্ষ্মণখোলা এলাকার বাসিন্দা এবং এই অস্ত্র পরিবহনে সরাসরি সহযোগী হিসেবে কাজ করছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ সূত্র।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জের কুখ্যাত অস্ত্র কারবারি টোকাই আমিরের নির্দেশেই শাকিল বিদেশি অস্ত্র নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। সীমান্ত দিয়ে অস্ত্র এনে রাজধানীতে সরবরাহ করাই ছিল এই চালানের মূল উদ্দেশ্য।
টোকাই আমির নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা হলেও বর্তমানে পরিবারসহ মালয়েশিয়ায় আত্মগোপনে রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বিদেশে পালিয়ে থাকলেও তার অপরাধ সাম্রাজ্য থেমে নেই।
অভিযোগ রয়েছে—আমিরের অনুপস্থিতিতে তার অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছে তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়, মিরপাড়া এলাকার রায়হান ওরফে রিঙ্কু।
হাইওয়ে পুলিশ ইলিয়টগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রুহুল আমিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “অস্ত্রগুলো কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় নেওয়া হচ্ছিল—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।”
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি (কুমিল্লা অঞ্চল) শাহিনুর আলম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—
# পলাতক রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের ক্যাডাররা কীভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে দেশের মহাসড়কে চলাচল করে ?
# সীমান্ত পেরিয়ে অবাধে অস্ত্র ঢোকার পেছনে কারা রয়েছে ?
# আর নারায়ণগঞ্জকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই অপরাধ নেটওয়ার্ক কবে ভাঙবে ?
বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা নয়; বরং রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় বেড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের গভীর শিকড়েরই বহিঃপ্রকাশ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই দাবি করছেন—শুধু ক্যাডার নয়, তাদের নেপথ্যের ‘গডফাদারদের’ও আইনের আওতায় আনা না হলে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলা দায়েরের পাশাপাশি পলাতক টোকাই আমির ও তার নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে তদন্ত জোরদার করা হচ্ছে।









Discussion about this post