নিজস্ব প্রতিবেদক :
নির্বাচনী আচরণবিধি যেখানে গণতন্ত্রের ন্যূনতম শালীনতা নিশ্চিত করার মূল হাতিয়ার, সেখানে সেই বিধিমালাকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করার ঘটনা আবারও উদ্বেগ বাড়াল।
সদর উপজেলার দেলপাড়া এলাকায় একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনী প্রচারণার মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগে বিএনপি জোটের প্রার্থীকে দেড় লাখ টাকা জরিমানা করা হলেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই প্রবণতা কি কেবল আর্থিক দণ্ডে থামবে ?
আজ শনিবার (৩১ জানুয়ারি) দুপুরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূরের নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে দেলপাড়া লিটল জিনিয়াস স্কুল অ্যান্ড কলেজে আয়োজিত বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থী মনির হোসাইন কাসেমী (খেজুর গাছ প্রতীক) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে ব্যবহার করেন। যা নির্বাচনী আচরণবিধিমালার ১৫(খ) ধারার সরাসরি ও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এটি কোনো ‘অনিচ্ছাকৃত ভুল’ নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্র পরিবেশকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য ব্যবহার করার দৃষ্টান্ত। আয়োজক ও প্রার্থীর প্রতিনিধি দোষ স্বীকার করলেও এই স্বীকারোক্তি দায়িত্বজ্ঞানহীনতার দায় লঘু করে না। বরং এটি প্রমাণ করে—আইন সম্পর্কে জানার পরও তা লঙ্ঘনের প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
ভ্রাম্যমাণ আদালত বিধিমালার ২৭(ক) ধারায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা তাৎক্ষণিক আদায় করলেও প্রশ্ন উঠছে, শুধুমাত্র অর্থদণ্ড কি ভবিষ্যতে এমন আচরণ রোধে যথেষ্ট ?
নির্বাচনের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে প্রচারণার প্ল্যাটফর্ম বানানোর প্রবণতা যদি রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় বন্ধ না করে, তবে নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা—দুটোই হুমকির মুখে পড়বে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান নূরের বক্তব্যে বিষয়টির গুরুত্ব স্পষ্ট—“শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচনী প্রচারণার জন্য নয়।”
এই বক্তব্য শুধু প্রশাসনিক সতর্কবার্তা নয়, বরং রাজনীতিবিদদের জন্য একটি নৈতিক নির্দেশনাও। শিক্ষাঙ্গন রাজনীতিমুক্ত রাখা রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং রাজনৈতিক দল—সবার যৌথ দায়িত্ব।
এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে আসে তা হলো—নির্বাচনের উত্তাপে রাজনীতিবিদরা কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেও ‘সহজ ভোট ব্যাংক’ হিসেবে দেখছেন? যদি তাই হয়, তবে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করে। কারণ শিক্ষাঙ্গন রাজনীতির দখলে গেলে সেখানে মুক্ত চিন্তা, নিরপেক্ষ শিক্ষা ও নিরাপদ পরিবেশ টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে।
গঠনমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, জরিমানার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক শাস্তি, প্রার্থীর বিরুদ্ধে সতর্কীকরণ বা পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের দায়ও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—তাদেরকেও রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিরোধে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে।
অন্যথায়, এমন ঘটনা একের পর এক ঘটতেই থাকবে, আর শিক্ষাঙ্গন ধীরে ধীরে পরিণত হবে নির্বাচনী প্রচারণার নীরব মঞ্চে—যা কোনোভাবেই গণতন্ত্র বা শিক্ষার জন্য শুভ নয়।









Discussion about this post